নীলাব্জ চক্রবর্তী

জীবাণু সংক্রমণ থেকে আপনার সুরক্ষার সহজ উপায় অথবা অন্য একটি শিরোনাম  


ফিরে ফিরে আসেন শ্যামল সিংহ আর বুনুয়েল। জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলের সামনের রাস্তাটা দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে বাঁধে উঠে পড়েন ওঁরা। দূরে মিলিয়ে যান আর কথাবার্তা চলতে থাকে ওঁদের। যেন সে শুনতে বুঝতে পারছে সব। শ্যামল সিংহের লাল অক্ষর, আলোচনা, জ্বলন্ত, টুপি, নবান্ন, সিম্ফনি, রান্নাঘর আর পোড়োবাড়ি এই আটটি কবিতা নিয়ে বুনুয়েল একটি চলচ্চিত্র তৈরী করতে চাইছেন আর সেই বিষয়ে ওঁদের আলোচনা চলতে থাকে... কমল হাসন, ফার্নান্দো রে, ক্যারোল বোকে আর অ্যাঞ্জেলা মোলিনা অভিনয় করবেন... ছবির নাম পোয়েটিক জাস্টিস হবে কিনা এখনো ঠিক হয়নি...

এর ঠিক পরেই সে বুঝতে পারছিলো অথবা একটা ভুলে যাওয়া গদ্য লেখার স্বপ্ন এই চলমান লেখাটার সাথে কীভাবে ওভারল্যাপ করছে। দু-এক জায়গায় তো লাইন-বাই-লাইন। মোদ্দা কথাটা হোলো স্বপ্নের চেয়ে অত্যাশ্চর্য কোনও চলচ্চিত্র কখনও সে দেখেনি আসলে। ওখানে শ্যামল সিংহের সাথে বুনুয়েলের দ্যাখা হয়ে যায়। তার মনেই থাকেনা যে সে ওঁদের দুজনের কারোরই গলার স্বর শোনেনি কখনো। আসলে লুপ্ত বলে কিছু হয়না। বরং একটা মেগা ইরেজারের কথা ভাবে সে। তোমাদের স্মৃতি নাই গো স্মৃতি? ভাবে একটা পারাপারহীন মস্ত পুকুরের কথা আর তাতে ভেসে ওঠা অসংখ্য মৃত ফাঁকা কাঁচের বয়ামের কথা। কথা জমিয়ে রাখার বয়াম আলো জমিয়ে রাখার বয়াম। সম্ভাব্যতা আর প্রতিসম্ভাব্যতাগুলো কিছুতেই যখন কনভার্জ করছেনা কেউ কেউ বলে উঠছে, আরেকটু বেঁকে যাও প্রিয় শীতকাল হে! অ্যাজ ইফ ওই রাস্তার দীর্ঘ আকার আর ওভারকোটের পকেট জুড়ে হাওয়াবাতাসবরফবারুদ খেলবে আর ক্রমে জমা হবে একটা একটা গদ্যকবিতার লাইন। তবুও পাতা ঝরে ঝরে একটা গুডলেন্থ স্পট। বুকসমান সব ডেলিভারী হোম ডেলিভারীর গাঢ় রুটম্যাপ। অর্থাৎ সে এগোবে না পিছোবে বুঝতে পারেনা এখানে। ফ্রন্টফুট না ব্যাকফুট।

আমি কিভাবে হেঁটে যাবো জ্যামিতি-বক্সের দিকে

তো সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো যে বিকেলটা আস্তে আস্তে আর অনিবার্যভাবে বাকল্ করে যাচ্ছে। আরে! হেই বিকেল! হো জিরাফপ্রতিম হোমোজিনিয়াস বিকেল আমার... এইভাবে তুমিও আপনিও... স্রেফ এইটুকু ভাবে ভাবতে পারে সে। নাহ। বাকল্ করার লক্ষণগুলো স্পষ্ট ফুটে উঠছে ক্রমাগত। স্লাম্প টেস্টে ফেইল করার ব্যাপার হলে অন্যকথা ছিল। সে তখন না হয় খানিকটা কেমিক্যাল অ্যাডমিক্সার মেশালেই ঠিক হয়ে যেত... কিন্তু, এখন সে করে কী! এক্ষুনি বিকেলের আনসাপোর্টেড লেন্থ কমাতে হবে। বাকলিং ঠ্যাকাতে এক্ষুনি একটা ব্রেসিং বা টাই ঠেকিয়ে দিতে হবে বিকেলের মাঝামাঝি। তারও আগে হিসেব করতে হবে বিকেলের মেজর অ্যাক্সিস বিকেলের মাইনর অ্যাক্সিস... ওহ আমাদের যাবতীয় স্লেণ্ডারনেস ওহ আমাদের রেডিয়াস অফ জাইরেশান... আপনারা একবার এই লাইনদুটোর সামনে এসে দাঁড়ান... একবার মনে মনে নিজেদের রিক্যালকুলেট করুন... একবার রিঅ্যাডজাস্ট করে নিন নিজেদের...

আপেলের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ছে বেড়াল
বেড়ালের ছায়ায় ভাসছে রান্নাঘর

ধরে নিন এই সেই আকাঙ্ক্ষিত ব্রেসিং মেম্বার... এই সেই বাকলিং অ্যারেস্টার... বিকেলের নিশ্চিত রক্ষাকর্তা...  আর এর ঠিক ঠিক আগেপিছেই লাফ দিয়ে ওঠে আর দুটো লাইন... ওহো গ্লাস... ওহো তাদের প্রকৃত অ্যালাইনমেন্ট...

মিলিটারির মতো মার্চ করতে করতে
                        পর পর চলে গেছে গ্লাস

এরপর, স্বাভাবিকভাবেই যা ঘটে তা এরকম... পর পর নানা রঙের লোকজন এসে জিগ্যেস করতে থাকে তাকে, এই, তুমি বুঝি সত্যিসত্যিই অ্যাতো সিরিয়াস?... আরে শোনোনা, সবসময় অ্যাতো কবিতাকবিতা করার কী আছে?... এই, তুমি মদ খাওনা ক্যানো?... সত্যি কোনোদিনও খাওনি?... মদ খাওনা তুমি কবিতা লিখবে কী করে?... ইয়ার্কি নাকি?...

ওহ কবিতা... ওহ কবিতাভুবন... ওহ কবিতাভুবনের বাইরের কিলবিল করা বাদবাকি মানুষজন... সে জানে ওরা কোনোদিন ডানলপ মোড়ে মাথা ঘুরে কাঠের বেঞ্চির ওপর পড়ে যায়নি... সে জানে ওরা কোনোদিন বুকপকেট থেকে মোবাইল ফোন বার করতে না পেরে কারোর কোনও বিশ্বদা-র নাম্বার বিড়বিড় করেনি... সে জানে ওরা সবাই প্রতিমাসে মাইনে পায়... সে জানে আল্টিমেটলি সবারই কোনোভাবে স্থির জীবন... কোনোভাবে স্থির জীবিকা... আর ধীরে কীভাবে অনিবার্য হয়ে ওঠে এই লাইনটার মুখোমুখি হওয়া...

জাহাজের ছায়ায় ছায়ায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে লোকটি

প্রায় একইভাবে যতবার শ্যামল সিংহ যুবতী শব্দটি লিখেছেন সে একটা দুপুর দেখতে পায়। ছমছমে। ভরদুপুর। এক এরকমই ভরদুপুরে বুনুয়েলের দীর্ঘ উটপাখীর সাথে দ্যাখা হয়ে যায় যুবতীর।

যুবতী দেখছে
লাল রুমাল খুলে দিচ্ছে পৃথিবী
যুবতী দেখছে
হলুদ রুমাল পড়ে আছে
            যুবতীর
                  পায়ের কাছে

ঘরের ভেতর একটা মিড শটের ঘর। ফ্রিজ হয়ে যাচ্ছে উটপাখির দৃশ্য। এই যাতায়াত। আবার প্রমাণ হয় যে শব্দের ডেরিভেটিভ তো মৃতদেহ। ডি ওয়াই ডি এক্স মনে পড়ে? সেই যে শব্দ সাজিয়ে সাজিয়ে কাঠামো সাজিয়ে সাজিয়ে... আর...

শব্দের তলা দিয়ে চলে যাচ্ছে
একটির পর একটি মৃতদেহ

একটা ফিল্ম বানানোর কথা কখনো সে নিজেও ভেবেছিলো কি? ঠিক মনে পড়ে না... একটা ইন্টারভিউয়ের দৃশ্য... পর পর টাইট ক্লোজ আপ... যেকোনো ভুলভাল অর্ডারে খণ্ড খণ্ড যৌনতার দৃশ্য মিশিয়ে দেওয়া ইন্টারভিউয়ের মধ্যে... বিয়ের গাড়ি থামিয়ে বমি করার দৃশ্য... স্লো মোশানে একটা মিছিল এগিয়ে যাচ্ছে... কোনও ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক নেই... শুধু কবিতার লাইন দিয়ে কার্ড করা হবে... একটা সিনেমাহল ভেঙে ফ্যালার দৃশ্য থাকবে... ওভারকোট পড়ে কারো ক্যামেরার দিকে পেছন করে দূরে কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য থাকবে... হেমন্তের দিকে চলে যাওয়া একটা ট্যাক্সির বিষণ্ণ দৃশ্য থাকবে... ক্যামেরা কোথায় বসবে গো ক্যামেরা?... একটু পরে গাঢ় জ্বর আসে লেখাটির সারাগায়ে। আর সে লক্ষ করে লিফটের লাইন থেকে ঝরে পড়ছে কুয়াশা। রোদ খুঁজতে বের হতে হবে তাকে। ক্রমশঃ দেওয়ালের তুলো থেকে নেমে আসতে থাকে নিজেরই বানানো সংস্কার আর পুরনো-হয়ে-যাওয়া-নতুন হরফ। লিভারে ফুলে উঠছে গতবছরের এরকমই বিকেলগুলো। তাকে প্রশ্ন করছে, তোমার বাড়ি আছে?... তোমার ঘর নেই?... এখন সে কী করে যে বলে, তার কাছ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে তার বাড়ি... তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তার ঘর... সংলাপে আর সংলাপের ভারে ছিঁড়ে পড়ছে বাসি রেডিওশহর... বরফের বুট... অথচ সরকারীভাবে তার কোনও তুষারপাতের স্মৃতি থাকতে নেই... ফলিত ভিসা থাকতে নেই... আর এইভাবে না-লেখা লেখাটা মাথার মধ্যে নিয়ে না-বানানো ফিল্মটা মাথার মধ্যে নিয়ে ক্রমাগত ঘুরতে থাকে সে। স্পষ্ট দেখতে পায়...

দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত
             ছড়িয়ে আছে আমাদের ভুলগুলি

আর চোখ ঘষতে থাকে ঘষতে থাকে আর চোখ লাল হয়ে আসে তার। সে জানে একদিন ঠিক নিজস্ব লাইব্রেরীবনের জানলায় ক্যামোন ঘন হয়ে আসবে ক্রিসমাসের রোদ নিউ ইয়ারের রোদ আর ওই রোদটার নাম হবে শ্যামল সিংহ।




উদ্ধৃত সমস্ত কবিতাংশ... শ্রী শ্যামল সিংহ-এর রচনা থেকে...

2 comments: