তেত্রিশ নং আসামী
ইন্সপেক্টর কানাইচরণ গুনে দেখেছেন অন্তত ৩২ জন
খুনি এখনও জেলের বাইরে খোলা ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ ৩২ টি খুনেরই তদন্ত শেষ হয়েছে, সন্দেহভাজনদের ধরা হয়েছে আর সেই
সন্দেহভাজনদের পেটের কথা বার করা হয়েছে। ৩২টি খুনের ৩২ জন আসামীই নিজের অপরাধ
স্বীকার করে নিয়েছে। ৩২টি আসামীর বিরুদ্ধে ৩০২ এর কেস দেওয়া হয়েছে। কিছু কেস এখনও
চলছে। বাকিগুলির নিষ্পত্তি হয়েছে, সাজা হয়েছে যাবজ্জীবন
কিংবা ফাঁসির। উচ্চ আদালতে আপিল করে যাবজ্জীবনের আসামী বয়েসের কারণে ১০ বছরের সাজা
কাটছে, ফাঁসির আসামীর সাজা পালটে হয়েছে যাবজ্জীবন। মোট কথা
কেসগুলি ক্লোজড্ হয়েছে। সাফল্যের সঙ্গে চাকরি জীবনের সব কেস সলভ করে ইন্সপেক্টর
কানাইচরণ ডিপার্টমেন্টের মেডেল পেয়েছেন। যে কেসগুলো এখনও আদালতে বিচারাধীন
সেগুলোরও শিগগির ফয়সলা হয়ে যাবে, কারণ প্রতিটি কেসেই অপরাধী
নিজের দোষ স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু এখন কানাইচরণ জানেন, একটি
কেসেও প্রকৃত অপরাধী ধরা পড়েনি। এখনও অন্তত ৩২ জন খুনি, খোলা
আকাশের নিচে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এই অনুভব কানাইচরণের কোনদিনও হত না যদি না
বেলেঘাটার হরিধন খাটুয়ার কেসের তদন্তভার তার কাঁধে এসে পড়ত। পূর্বের ৩২টা কেসের
মতই ৩৩ নম্বর খুনের কেসও সলভ করতে কানাইচরণের দুই হপ্তা লাগলো। হরিধন খাটুয়া, বছর চোদ্দর ছেলে, বড়বাজারে মারোয়ারিদের স্কুলের ক্লাস সেভেনের ছাত্র। বয়েস অনুযায়ী দেখতে
গেলে কয়েকটা ক্লাসে সে নির্ঘাত ফেল করেছিল। বুধবার, বারোই মে
, বিকেলে সে বাড়ি থেকে বেরোয়, আর
ফেরেনি। প্রথমে মিসিং ডায়েরি ছিল, তারপর গার্ডেন রিচ এর দিকে
একটা পরিত্যক্ত ঘাট থেকে পাওয়া বেওয়ারিশ লাশকে হরিধনের ফ্যামিলি আইডেন্টিফাই করে।
বৈঠকখানা বাজারে হরিধন খাটুয়ার বাপের লোহালস্করের ছোট ঘর, শত্রু
আছে কিছু, বাজারে তোলাবাজদের সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক।মিডিয়া
কেসটা খেল। কানাইচরণ ফাইলটা হাতে পেয়ে বাপের বিজনেসের কয়েকজন শত্রুমিত্রকে জেরা
করল, পাড়ার দু একজন প্রতিবেশিকে লালবাজারে ডেকে পাঠালো। হরিধনের
এক বন্ধুর খোঁজ পাওয়া গেল। কানাইচরণ শুনলো-বাপের দোকানের কর্মচারিরা অনেকবার
জগন্নাথ ঘাটে একসঙ্গে দুজনকে নেশা করতে দেখেছে। বন্ধুটির নাম জগগোবিন্দ দুবে। মিডিয়া
অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছিল। দু হপ্তা হতে চললো, কেস এর ফয়সালা হচ্ছে
না। এরেস্ট হয়নি তখনও কেউ। কানাইচরণ দুদিন মৌখিক জিজ্ঞাসাবাদের পর জগগোবিন্দকে
বড়বাজার থানার সেফহাউসে ঢুকিয়ে উদোম বাটাম ঢোকালো। সে সব স্বীকার করে নিল, জগন্নাথ ঘাটে নিয়ে গিয়ে সব দেখিয়ে দিল-কিভাবে খুন করেছে, তারপর বডি গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছে। যেভাবে আগের ৩২টা কেস এর সমাধান হয়েছে,
এই কেসটাও মিটে গেল।
মুশকিলটা হল, সব মিটে যাওয়ার চারদিনের মাথায় মৃত ছেলেটি, হরিধন খাটুয়া, জলজ্যান্ত ফিরে এল। গায়ে আঁচড়ের
দাগটুকু নেউ, ফটো-ভোটার কার্ড সব কিছুর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা
গেল এতটুকু ভুল নেই, বাপ-মা ছেলেকে বুকে টেনে নিলে। হরিধনের
চোখেমুখে উদ্ভ্রান্তভাব, কোথায় ছিল, কি
করছিল কিছুই বলতে পারল না। সবাই ধরে নিল নেশাটেশা করে পালিয়েছিল। মুখ পুড়লো
পুলিশের, ডেপুটি কমিশনার-সাহেব ইন্সপেক্টর কানাইচরণকে
চেম্বারে ডেকে র্যামপার্ট ঝাড়লেন। কানাইচরণ বিড়বিড় করে বলতে যাচ্ছিল, খুনের চেষ্টার কেস এখনও দেওয়া যেতে পারে, ৩০২ তুলে
নিয়ে। হরিধনের ফ্যামিলি যেখানে বডি সনাক্ত করেছিল ইত্যাদি। ডি সি ডি ডি পেপারওয়েট
ছুঁড়তে বাকি রাখলেন। যে লোক মরে গেছে তার স্বীকারোক্তি কি করে পাওয়া গেল ! পারিপার্শ্বিক
প্রমাণের কথা বললে তাও একরকম মুখ রক্ষা হত। ইউনিয়ানের খাতিরে আর কানাইচরণের বয়েসের
কথা ভেবে কানাইচরণের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হল না। কানাইচরণ জীবনে এই
প্রথমবার ভাবলেন-তার খ্যাতির বারোয়ানাই কি মাটি ! ৩২ জন খুনিই কি তাহলে শাস্তি
এড়িয়ে যেতে পারল। এই কথা সহকর্মী, ও সি, ডেপুটি কমিশনার কারোর কাছে গিয়েই বলতে পারে না কানাইচরণ। ভিতরে ভিতরে চোয়া
ঢেঁকুর উঠতে থাকে। এই বুঝি পুরানো ফাইল রিওপেন হতে শুরু করবে। রাত্তিরবেলা স্বপ্নে
দেখেন পুরানো ফাইলের স্তুপ থেকে গিজগিজ করে কীটপতঙ্গের দল এসে তাকে ঘিরে ধরছে। কানাইচরণের
অবসরের আর দুবছর বাকি, শক্ত ধাতের মানুষ, হাতে লোহার বালা পড়েন। অল্প বয়েসে জামার বুক খুলে এজলাসে সাক্ষী দিতে গিয়ে
জাজেসদের কাছে ঝাড় খেয়েছেন। এইসব স্বপ্নটপ্ন সামলে নেবেন। কিন্তু আজকাল আর কাউকেই
বিশ্বাস করতে পারছেন না। মনে হচ্ছে, সব শালা একটা খুন নিজের
মধ্যে লুকিয়ে ঘুরছে।
হরিধন খাটুয়ার ঘটনার চার সপ্তাহ পরে, আরেক বুধবার কানাইচরণ প্রবল
বুকজ্বালা নিয়ে ভরদুপুরবেলা সেসিলবারে ঢুকলেন। এক প্লেট মিক্সড পকোড়া আর এসি
ব্ল্যাক নিয়ে বসতে যাবেন, দেখেন পুরানো খোঁচর -সুবিমল একগাল
হেসে টেবিলে বসল।
সুবিমলকে দেখলে কেউ বলতে পারবে না যে সে লালবাজারে
খোঁচর, টাকমাথা,
চশমা আর হাতে সর্বক্ষণের চটের ব্যাগ। কানাইচরণ পাত্তা দিতে চাইছিলেন
না, কিন্তু সুবিমল গলা নামিয়ে বলল-দাদা কি আগের ৩২টা নিয়ে
চিন্তায় রয়েছেন !
কানাইচরণ সুবিমলকে শুধু বসতে বললেন তাই নয় নিজের
খাতায় একটা বিয়ারও অফার করলেন। কানাইচরণকে বিস্মিত দেখে সুবিমল বলল-চিন্তা করবেন
না , ডিপার্টমেন্টে
কিছু শুনিনি। জানি এমনটা হয়। একটা ইঁট সরে গেলে মনে হয় বাড়িটাই এবার পড়ে যাবে। আপনি
তো পরীক্ষা দিয়ে লালবাজারে ঢুকেছেন আর আমি স্কুল ড্রপআউট। বড়বাবুদের এরকম ফিলিং
সত্তর বছর ধরে দেখেছি।
কানাইচরণ বললো-জানিস, রাস্তায় মনে হয় সব লোকজনকে,
দুনিয়াশুদ্ধু সবাইকে ভিতরে ঢুকিয়ে জেরা করি আর বলি কটা মার্ডার
করেছিস, বল্ ! তারপরেই মনে হয় যদি আরেকটা ফলস্
স্বীকারোক্তি দিয়ে দেয় ।
সুবিমল দু নম্বর বিয়ারের ব্যবস্থা করে বলে-আপনি
ভাববেন না, কেউ সুখে নেই দাদা, সক্কলে অসুখী। যে ৩২ জন ,
সংখ্যাটা হোপফুলি কমই হবে, বেঁচে গেল-সাজা
পাওয়ার থেকে, আপনার মনে হয় তারা দিব্যি আনন্দে আছে? আগুন, বেঁচেও নরকে থাকার আগুন।
কানাইচরণ বলেন-কে জানে ! তবে হ্যাঁ, দুতিনটে কনভিক্টেড ওই ৩২ এর মধ্যে
কিন্তু জেনুইন। আর ৩২টারই বডি সনাক্ত হয়েছে, কোন ডিসপিউট
নেই।
-বাকিগুলোকেও তো আপনি খাওয়াপরার চিন্তা থেকে মুক্তি
দিয়েছেন। জেলে তোফাই থাকবে।
-হ্যাঁ হ্যাঁ তা থাকবে, আজকাল তো
নাটকফাটকও হয় জেলে।
সুবিমল একটা পকোড়া তুলে বললো-একটা শহুরে গল্পকথা
আছে জানেন। সত্যিমিথ্যে জানিনা। চিনেবাজারে একটা আয়না বিকোয়, বিকিয়েই যাচ্ছে একই আয়না আজ একশো
বছর ধরে নাকি, অভিশপ্ত আয়না।সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটা
মেয়ে সুইসাইড করেছিল। তার বর নাকি লুকিয়ে পরকীয়া করত, মেয়েটা
জানতে পেরে গেছিল। সেই থেকে এই আয়নাটা নাকি মানুষের আত্মা অবধি দেখতে পারে। কোন
পাপী সেই আয়নার সামনে দাঁড়ালে আয়না মুহুর্তে বুঝে যাবে।
একটা হিক্কা তুলে কানাইচরণ বললেন-ধুস্।
-আহা শুনুনই না, সেই আয়নার সামনে
কোন পাপী দাঁড়ালে তার সাক্ষাৎ মৃত্যু আর নিরপরাধ দাঁড়ালে আয়নাটা দুটুকরো হয়ে ভেঙে
অকেজো হয়ে যাবে। আর অকেজো আয়নার ঠাঁই হবে ফের চিনেবাজারে। নিরপরাধের বালটাও ছেঁড়া
যাবে না। অন্য দুনিয়ার আয়না দাদা। যে দুনিয়াতে পাপের প্রকৃত বিচার হয়।
-বলিস কি
-আর আয়নাটার বিশেষ গুণ এই যে সে বরাবরই পাপীদের কাছেই
ফিরে যায়। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন দাদা, ওই ৩২ জন প্রকৃতির
নিয়মেই সাজা পেয়ে গেছে।
কানাইচরণ বিল মেটাতে মেটাতে হাসলেন-তোর মঙ্গল হোক, মনটা ফুরফুরে লাগছে। যাই
চিনেবাজারেই যাই, আয়না না পেলে তোর বউদির জন্য একটা
ল্যাম্পশেডই কিনবো।
কানাইচরণ সেসিল বার থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি
নিলেন। সুবিমলের কাঁধে হাত রেখে ট্যাক্সিতে উঠলেন। টা টা করে চলে গেলেন। সুবিমল
অল্প টলতে টলতে ডেপুটি কমিশনারের ঘরে এসে পৌঁছল। জাঁদরেল আই পি এস সুবিমলকে
জিজ্ঞেস করলেন-কি রে,গোয়েন্দা কানাই শান্ত হয়েছে?
-হ্যাঁ সার, বুঝিয়ে দিয়েছি,
এখন ফুরফুরে মেজাজে চিনাবাজার চললেন বউদির জন্য গিফট কিনবেন। সুবিমল
হাসল।
ডেপুটি কমিশনারও মৃদু হেসে ফেললেন-বেশিই বকাঝকা
করে ফেলেছিলাম, গোয়েন্দা মনমরা হয়ে গেলে কি করে চলবে ! ৩২ কেস ক্লোজড তো করেছে, অন্তত, মিডিয়াকেও ভালো ট্যাকল করে। বলে ডেপুটি
কমিশনার রিক্লাইনারে বসে বসেই দুললেন। সুবিমল সেলাম ঠুকে বেরিয়ে এল।
ইন্সপেক্টর কানাইচরণ তখন ট্যাক্সিতে। ট্যাক্সি
গুমোট ভবানীপুরের গলির মধ্যে ঘুরছে। কানাইচরণ দিগনির্দেশ দিচ্ছেন। ঝুপসি সন্ধে
নামছে, রাস্তার
হ্যালোজেন জ্বলে উঠেছে। কানাইচরণ জানতেন সিরিয়াল কিলার আবার নিজের প্রথম অপরাধের
জায়গায় ফিরে আসে। আজ মনে হল, গোয়েন্দাও নিজের প্রথম কেসের
কাছে ফিরে আসে। দূর থেকে ঠাউর হল অল্প আলোয় একটি অনতি-পরিচিত বাড়ি, জরাজীর্ণ,রাস্তা-পাঁচিল আর বাড়ির মধ্যে দু আঙুলের
ফারাক, বটগাছ গজিয়েছে দেয়ালে। এই বাড়িতেই একটা হোমিসাইডের
সমাধান করেছিলেন বছর তিরিশ আগে। ইমমোরাল রিলেশানের মোটিভ দেখিয়েছিলেন ভেবে সেই
পুরানো তৃপ্তিবোধটা কানাইচরণ আর পেলেন না। রায়ে মৃতার জ্ঞাতিদাদার যাবজ্জীবন হয়।
কানাইচরণের তখনও একমাথা চুল, বেলবটম পড়তেন, বিয়ে হয়নি। কমিশনারসাহেব নিজে ফাইল কানাইচরণের হাতে দিয়েছিলেন। দুই হপ্তায়
সাসপেক্ট অপরাধ স্বীকার করে নেয়। খবরকাগজগুলি ঘটনাটা ভুলে গেছে, রাস্তার দুধারে হাল আমলের বাড়ি আর ফ্ল্যাট। কেবল বাড়িটাকে দেখলে মনে হয়,
একটা হত্যার স্মৃতি নিয়ে বাড়িটা কাবু হয়ে পড়েছে। কানাইচরণ নিশ্চিত
এখনও মৃতার কয়েকজন ফ্যামিলি মেম্বার এই বাড়িতেই থাকয়ে, তারাও
কেসে সাক্ষী ছিল। কানাইচরণ ট্যাক্সিকে থামতে বলেন। একটা মাঝারি মাপের আয়না নিয়ে
ট্যাক্সি থেকে নেমে আসেন গোয়েন্দা কানাইচরণ। ড্রাইভারকে বলেন-পালাসনা বাবা,
পাঁচমিনিটে কাজ সেরে ফিরব। বাড়ি ফেরার তাড়া আছে।হাতে সময় নেই।
কানাইচরণ বাড়িটার ভিতরে ঢুকে পড়েন। ড্রাইভারটি
স্টিয়ারিং এ টোকা মেরে হিন্দি গানের কলি গুনগুন করতে থাকে।
DARUN LIKHECHHO. KHUB VALO TREATMENT. TOMAR KACHH THEKE ERAKAM AARO GALPO PAOWAR ICHHE ROILO. ASCHHO KABE ?
ReplyDelete