অঙ্কের দিদিমনি
শুরু বা শেষ বলে কিছু হয় না। জীবনযাপন বা
জীবনকথনেরও হয় না। তবু , নিজদের সুবিধার্থে একটা বিন্দু ধরতে হয়। তা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। যে কোনও
অন্য বিন্দুর সঙ্গে তার যোগসূত্র থাকে , তবে তা খুঁজতে হয়। এই লেখা সুস্মিতাকে
নিয়ে। ধরা যাক সুস্মিতার প্রথম বিন্দু হরপ্রসাদ , তাই শুরুতেই হরপ্রসাদ। আর, ছোটবেলায় অল্প
পড়াশোনার দৌলতে হরপ্রসাদের দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছিল , পৃথিবীর অধিকাংশ ভাল লেখা শুরু
হয়, ‘ওয়ানস্ আপন এ টাইম’ দিয়ে। তাই...
একদা হরপ্রসাদ নামে এক কর্মঠ ও সদাশয়
ব্যক্তি দিনে চারবার রেললাইন পারাপার করতেন। শীত , বর্ষা ,গ্রীষ্ম – সব ঋতুতে। কেন না, টানা একশো আশি বিঘে উৎপাতহীন , একঘেয়ে
মসৃণ চাষের জমি আজকাল আর পাওয়া যায় না। হরপ্রসাদের সময় যেত। এবং, হরপ্রসাদের তা ছিল । জমি লাইনের ওপারে ,
বাড়ি লাইনের এপারে। জমি যেমন লম্বা-চওড়া ,বাড়িও তেমন পেল্লায়। একদম সিগন্যালের গা
ঘেঁষে। ভারি মেল ট্রেন
কিংবা অনিঃশেষ ওয়াগন গেলে দশ ফুট পাঁচিলে ঘেরা বাড়িতে গুমগুম শব্দ হতো, চুন-সুড়কির
ধুলো উড়ত। থরথর করত জানালা-দরজা। লাগোয়া আয়তকার পুকুরের জল নড়ত কলতলার ডেকচির মতো। ঘাটের সিঁড়ী থেকে
ছুটে পালাত তেচোকা-খোরস্লা। ট্রেন আসুক বা না আসুক , মাঠভর্তি শস্য-আকুল গাছপালায়
অহরহ ঢেউ খেলত। হরপ্রসাদ এপার-ওপার হতেন চারবার। ভোরে গিয়ে বারোটায় ফেরা, তারপর একটায় গিয়ে
ছ’টায়। এতেই জীবনের বেশিটা
কেটে গেছে তাঁর। জমি ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে যথেষ্ট বড়লোক হয়ে যাওয়ার পর মন বলল,
এবার আত্মার জন্য কিছু কর্। একটা শুভদিন দেখে নিরামিষ খেয়ে হরপ্রসাদ ডায়েরি লেখা শুরু
করলেন।সবচেয়ে বড় পিপুল গাছটার নিচে বসে। যার শিকড় ছড়িয়ে গেছে রেললাইনের কাঠের
স্লিপার অবধি। মাঝেমাঝে ক্ষেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুনিষদের দেখেন আর ফাঁকফোকরে লেখেন।লেখা
শুরু করে তিনি বুঝতে পারলেন দুটি সরল সত্য।এক,মানুষ নিয়ে লেখার কিছু নেই , তার
চেয়ে অনেক জ্যান্ত জীবন ব্যস্ত ও ন্যস্ত রয়েছে পোকামাকড় ও পশুপাখিতে। দুই ,
একজায়গায় বসে লিখলে হবে না , লিখতে হবে ঘুরেঘুরে-দুরেদুরে। ভ্রমণ মানুষের দৃষ্টি প্রসারিত করে , নিসর্গের
পরিবর্তন মানুষকে তাজা রাখে। হিংসায় অনীহা থাকায় পশু বাদ দিয়ে হরপ্রসাদ মনোনিবেশ
করলেন পোকা ও পাখিতে । পাখির গায়ের উকুন, গোবরে পোকা , ধামসা পোকা , গান্ধী পোকা , উচ্চিংড়ে , কুমরে
থেকে জোনাকি অবধি শ’দেড়েক পোকা বিষয়ে তিনি লিখে ফেললেন অনধিক দেড়শ শব্দ ক’রে । অল্প দেখা আর কিছু
শোনায় অর্জিত প্রবল আত্মবিশ্বাস সৃষ্ট লেখাগুলো বহু ভুলে ভরা থাকলেও আন্তরিকতায়
বেশ পাঠযোগ্য হয়ে উঠল।
বোলতা , জোঁক , শুঁয়াপোকা , কেঁচো ,
কেন্নো , বিছে , পিঁপড়ে , মথ এবং আরশোলাসহ আরও অনেকে স্থান পেল তাঁর অপ্রকাশিত
রচনাবলীতে। জ্ঞানের গভীরতা ও বিজ্ঞানের বিশ্লেষণের দিকে নজর না থাকলেও পরম
ভালবাসায় লিখে চললেন তিনি। বছরের পর বছর। পোকা ফুরিয়ে এলে ধরলেন পাখি। ডায়েরির পর
ডায়েরি ফুরিয়ে গেল। মাঝেমাঝে এল খাতা , হালখাতা , জাবেদা খাতা। অক্ষরের মধ্যে তখন
তাঁর বসবাস। অক্ষরবৃত্ত ঘিরে ফেলেছে তাঁর জীবন । অপটু রেখায় প্রাণীদের
ড্রয়িং-ও করলেন । এ জন্য বৈষয়িক ব্যাবস্থাপনা কে অবশ্য বিঘ্নিত করলেন না ।গোলা ভরে উঠত ফসলে আর অ্যালুমিনিয়ামের ট্রাঙ্ক
ভরে উঠত লেখায় ।ইতিমধ্যে বাড়ির চওড়া কার্নিশ থেকে উঁকি মারতে শুরু করেছে বট-অশ্বত্থের চারা। এর
মধ্যে একটা গাড়ি হল , কোথাও যাবার ছিল না , তবু আত্মীয়-পড়শি দের প্ররোচনায় হল। দেখতে আদি রোলস রয়েসের মতো,
দু’পাশে দুটো চাকা লাগানো ছিল কোমরের সোনার বিছের তুল্য সেক্স-সিম্বল হিসেবে। দূরের
আত্মীয়রা যেত , কাছের মন্দিরে পিকনিক করতে , আর , পাড়ার লোকের তা কাজে লাগত
রুগীদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে । সবচেয়ে জরুরী দিনেই গাড়িটা বিগড়ে গেল , স্ত্রী মারা গেলেন
বিনা চিকিৎসায়। কিন্তু লেখার নেশা আর জমির ল্যান্ডস্কেপ হরপ্রসাদ কে দুঃখ পেতে দিল
না। লিখতে লিখতে তিনি বুড়ো হয়ে গেলেন । মহৎ কিছু যে লিখলেন
তা নয় , তবু , তাঁর বিশ্বাস ছিল
জীবনটা কাজের মধ্যে কেটেছে । লেখা তো লোকের জন্য নয় তাই তারা
কিভাবে নেবে তা জরুরি নয় । অগাবগা একটা জীবন না কাটিয়ে ছোটো
ছোটো প্রানের মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাওয়া কম আনন্দের নয় । নিজের ধারণা অনুযায়ী
হরপ্রসাদের ডায়েরীর প্রথম বাক্যটা ছিল – ‘একদা
আমার জমিতে অনেকপ্রকার পোকামাকড় বসবাস করত ’। এটা লিখে নিজের কানে
খটকা লাগায় তিনি তাঁর সেই ‘ওয়ানস্ আপন এ টাইম ’- এর গেরো ছিঁড়ে ফেলেন । হরপ্রসাদের প্রতি সুবিচার করার জন্য দু’একটা
উদাহরণ দেওয়া জরুরী । আফটার অল তিনি সুস্মিতার প্রথম বিন্দু , সুস্মিতার ঠাকুরদা ।
আরশোলা ঃ – পৃথিবীর প্রাচীনতম এই প্রাণীটির স্থায়িত্ব প্রমাণ করে চেষ্টা
করলে মানুষও অমর হতে পারে । কিন্তু , মানুষ আরশোলার
মতো সিরিয়াস নয়। নিজের কাজের চেয়ে অন্যের
কাজে বেশি মাথা গলায় । কাজ আর অকাজ, এই
দুইয়ের সীমারেখা মানুষ অকাজের দল পাকায় । মানুষের পছন্দ-অপছন্দ তীব্র । এটা মোটেই গুণ নয়। এতে আয়ু কমে । আরশোলার কাছে কোনও খাদ্যই অখাদ্য নয় । তুঁতে মেশানো আঠা গোলা থেকে হার্ডবোর্ড বইয়ের মলাট , এমনকি ঘুমন্ত মানুষের নরম স্থানের ও সুযোগ মতো অস্থানের সুস্বাদু
মাংস তারা খেয়ে থাকে । এই বিচারহীনতা তাদের মধ্যে আসক্তি
সঞ্চার করেনি । আসক্তি মনকে ক্ষুদ্র করে , জীবনকে ছোটো করে । এইসব হয়ত বুঝে বা না
বুঝে আরশোলা টিকে আছে আদি থেকে , অকৃত্রিমভাবে । তাদের দৃষ্টি নেই । শুঁড় ছুঁয়ে ছুঁয়ে পথ খোঁজে । তাদের গা তেলালো , পদ্মপাতার মতো । বৃষ্টির জল , সকালের শিশির , বাচ্চাদের হিসি পিছলে যায়
। তাদের মনে ছাপ ফেলে না। আরশোলাকুলের স্থায়িত্বের অপর বড় কারণ
হল তাদের সৌন্দর্যচেতনা নেই । মানুষের আছে । সৌন্দর্যবোধ মানুষকে কুরে কুরে খায় । ভেতরে পুড়িয়ে দেয়। এতেও আয়ু কমে । ছোটবেলায় একবার ঘুমের সময় আমার ডানচোখের পাতার একটু
মাংস খেয়েছিল একটা আরশোলা । মা বলেছিলেন অন্তর্দৃষ্টি বাড়ছে
। জানি না সেটা হয়েছে কি না ।
পিঁপড়ে ঃ- একমাত্র ইহাদের দেখেই মনে হয়েছে মানুষ বুদ্ধিমান হলেও এতটা ভদ্রসভ্য
নয় , সিনসিয়ার তো নয়ই । মানুষের বুদ্ধি সাধারণত
দুর্বুদ্ধির খাতে বয় । পিঁপড়েরাও দল বেঁধে বাস করে , ঘরবাড়ি বানায় , সন্তানদের রক্ষা করে সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে । এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো এতই সংসারী যে আমরা যেমন গরু পুষে দুধ খাই , এরা তেমন এক ধরনের ছোট ছোট পোকা পুষে তাদের থেকে মিষ্টি খাবার সংগ্রহ করে । গাছের পাতার ওপর পাখির বিষ্ঠার মতো একরকম সাদা ছিটে দেখা যায় । মানুষের মনে ভ্রম জাগানোর জন্য । তার নিচে থাকে পিঁপড়েদের ব্যক্তিগত
মিষ্টি পোকার ফার্ম । কয়েকপ্রকার পিঁপড়ে সুন্দর চাষাবাদ করে । কিন্তু মানুষের মতো নিজেদের সম্পদ বাড়ায় না । সমষ্টির উন্নতি ভিন্ন
চিন্তা নেই । তাদের নেই একক উচ্চাকাঙ্খা । এমনকি তাদের রাণীও আয়েসি
নয় , খেটে খেতে হয় তাকেও । খাবার সংগ্রহ করে পিঁপড়েরা যখন বাসার পানে যায় , পথিমধ্যে অন্য পিঁপড়ে শুঁয়ো নেড়ে খিদে জাহির করলে তারা দিয়ে দেয় । তামাক জমিতে সচরাচর চার প্রকার পিঁপড়ে দেখা যায় – ডেঁয়ো , সুড়সুড়ে , কাঠপিঁপড়ে আর লাল পিঁপড়ে । আরও একধরণের বিচ্ছিরি
গন্ধযুক্ত সূক্ষ্ম পিঁপড়ে আছে , যা কেবল বাড়িতেই দেখেছি । লাল পিঁপড়েরা রাগী আর
হিংস্র । সুড়সুড়েরা নিরীহ এবং আধুনিক সময়ের দোষে আক্রান্ত , কারণ , তারা বিচ্ছিন্ন
ও অন্যমনস্ক । অন্যরা মহাভারতের রণক্ষেত্রে রচিত ব্যুহ গড়ে চলাফেরা করে। কাঠপিঁপড়ে
বিষাক্ত এবং শক্তিশালী । আমার ছেলেবেলার বন্ধু পটলকে জামগাছের উঁচু ডাল থেকে ছুঁড়ে
ফেলে দিয়েছিল । সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে পটল পারেনি । নিচে শুকনো ডাল থাকায় সে
রক্ষা পায় । মানুষের মা –রা পিঁপড়েমিশ্রিত দুধ খাইয়ে বলে ‘সাঁতার শিখবে ’ । সে
আসলে নিজেদের ব্যার্থতার ওপরে পুলটিস । পিঁপড়ে খাওয়া বহু বাচ্চাকে আমি ডুবে যেতে
দেখেছি ।
এরকম আবোলতাবোল লেখালিখির মধ্যে
যুক্তিপরম্পরা ছিল না । জামগাছতলায় খেজুরপাতা কেন ? অথবা , সৌন্দর্যচেতনা না হয়
আরশোলার নেই , তা জলঢোঁড়া সাপের কি আছে , নয়তো তারা স্বল্পজীবী কেন ? – এ জাতীয়
প্রশ্নের উত্তর বা সুত্র তাঁর লেখায় ছিল না ।
পোকামাকড়ের বৃত্তান্ত অনেকটা হওয়ার
পর সাধের মুনিষদের কিছু দান করে হরপ্রসাদ যাত্রা করলেন পক্ষীকুলের দিকে । শুরুটা
নীরপতত্রী, অর্থাৎ জলচারীদের দিয়ে । পানকৌড়ি , গাংচিল বা গাংতিতি তাঁর প্রিয় পাখি
। তারপর শাখারি , মুনিয়া , বসন্তবৌরি , ভরত ,নরুনচোরা , খঞ্জন , দোয়েল , চিল , বাজ
, টুনটুনি , শকুন, শালিখ, বক প্রমুখ দেখা- পাখির সঙ্গে কাজলভ্রমরা ,
হামিংবার্ড এবং দুর্গাটুনটুনির মতো
শোনা-পাখিতে ভরে ওঠে তাঁর লেখকজীবনের সেকেন্ড হাফ । ভুঁড়োচিল, মাছরাঙা, দাঁড়কাক ,
ম্যাকাও, কাকাতুয়া, ফিঙে, বগা-বগী, আর তিতিরদের মন বুঝতে গিয়ে মা-হারা একমাত্র
ছেলেটার দিকে তাকানো হল না । এইপর্বে হরপ্রসাদের কল্পনা পুরুষ্ট হয় অনুশীলনের ফলে
। তাই পাখি বিষয়ে ছোট ছোট গল্পও লেখেন তাদের বৈশিষ্ট্য বোঝাতে । এর মাঝে আঁকায়
উন্নতি হয় ; উড়ে যাওয়ার সময় কোনো কোনো পাখি আত্মপ্রতিকৃতি দেখে চমকে ওঠে , তাঁদের
ডানায় খিল লেগে যায় । বিশেষত, সিপাহি বুলবুল , হাঁড়িচাচা ও বাইল্যার(এ দেশের
বাবুই) ছবিগুলো অপূর্ব । এ থেকেই ফ্রন্ট ও ব্যাক কভার হওয়া উচিত। কিন্তু যা
অপ্রকাশিত তার আবার প্রচ্ছদ।
পাখিদের বিষয়ে সব লেখা শেষ হতে হতে
মোটামুটি পড়াশুনো করে বড় হয়ে যাওয়া নির্বান্ধব ছেলে দেবপ্রসাদের বিয়ে হয়ে গেল ।
আত্মীয়স্বজনরাই ধরেকরে দিয়ে দিল । পাঁচ বছরের মাথায় একটা মেয়েও হয়ে গেল । এত আনন্দ
হরপ্রসাদ কখনো পাননি । নাত্নি কোল থেকে নামতেই চায় না। খাওয়ানো, নাওয়ানো,
খেলাধুলা, কথাবার্তা সব নাত্নির সঙ্গে । যে যার ভাষায় কথা বলে। এ’ভাবে সুস্মিতা যখন
ছুটতে শিখে গেছে এমন এক দিনে হিমাংশু আসে শহর থেকে । তাঁর হাতে পড়ে শ্যালকের একটা
ডায়েরি। উল্টেপাল্টে পড়ে তিনি বলেন , ছাইপাঁশ লিখে জীবনটা নষ্ট করলে ভায়া, এসব তো
আগেও লেখা হয়ে গেছে।
প্রথমে মুষড়ে পড়লেও, এ পৃথিবীর নানা প্রান্তে
কতরকম মানুষ একইরকমভাবে বেঁচে আছে, বেঁচে চলেছে-
এই ভেবে হরপ্রসাদ কিছুটা সান্ত্বনা
পান ।
- নতুন কিছুই তুমি জানাওনি, হিমাংশু দমেন না ।
- তা হোকগে। আমি তো জানাতে চাইনি । জানতে চেয়েছি । কারও
সাহায্য ছাড়া নিজে নিজে একলা বসে চাষের ফাঁকে আর সংসারের ফোকরে এইসব দেখলাম,
জানলাম , এই-ই বা কম কি । জানুক না অন্যে , প্রত্যেককে নিজের আবিষ্কার নিজেকে করতে
হয় হিমু ।
- জানা আসলে পুনর্বার জানা , বোর্হেসিয়ান এই উক্তির
প্রতিধ্বনি করে হিমাংশু বলেন , ঝাড়া আসলে পুনর্বার ঝাড়া । শালাকে ছোট করতে চান
তিনি । কিন্তু ততদিনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণের সান্নিধ্যে হরপ্রসাদের চারপাশে এক
স্বর্গীয় বলয় তৈরি হয়েছে , বক্রোক্তি তাঁকে স্পর্শ করে না। ‘হিমু রাতের বাবলা গাছে
কখনো জোনাকির ঝাঁক দেখেছিস ? দেখবি আগের দিনের সঙ্গে মিল নেই। দেখবি কত জানা, তবু
কত অচেনা । দেখবি সব জানা নিজের মতো করে বারবার জানতে হয়। এমনকি সামান্য হাঁটাও ।’
স্বপ্নাচ্ছন্ন শোনায় তাঁকে ।
- সে রাতে সুস্মিতাকে কোলে ক’রে ছাদে ঘুরতে ঘুরতে স্বচ্ছ আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে হরপ্রসাদ ভাবেন এই
মুহূর্তে কত পিতামহ কত নাত্নি কোলে ছাদে দাঁড়িয়ে আছে । কত মানুষ পৃথিবীর নানা
প্রান্তে আলাদা ভাষায় একই ভাবনা ভেবে চলেছে । এভাবে খণ্ড খণ্ড মানুষ পূর্ণ ভাবনার
দিকে যায় । কেউ হয়তো তার মতো অপ্রকাশিতব্য কিছু-না-কিছু লিখেও ফেলেছে । আঃ, কী
সুন্দর একটা গ্রহেই না জীবনটা কাটল !
এরপর হরপ্রসাদ আর বেশিদিন বাঁচেননি।
সত্তরের পর শেষ একটা বছর তাঁর রুটিন ছিল এইরকম – দ্বিতীয় দফায় রেললাইন টপকে ক্ষেতে
যাওয়া। স্কুলের খাতাবই নিয়ে সে মেয়ে যেত তাঁর আঙুল ধরে। সে মেয়ে সারাক্ষণ বকবকম করত।
ঠাকুরদাও । আলাদা ভাষার দুই মানুষ বাড়ি ফিরত সন্ধেবেলা । এর মাঝে হরপ্রসাদ খুলে
বসতেন পুরনো ডায়েরি, এক এক দিন এক একটা। গভীর মমতায় তাকিয়ে থাকতেন সেগুলোর দিকে,
শিল্পী যেমন তার সৃষ্টির দিকে চেয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে, আর, অসমাপ্ত কাজের হিসেব
করে । এই শেষ না হওয়া কাজ আর অতৃপ্তি মানুষকে এগিয়ে নিয়ে চলে। পনের-কুড়ি মিটার
পরিধির মধ্যে ঘোরাফেরা ক’রত সুস্মিতা কখনও বা পাঠ্যবই খুলে বসত । এ’রকম এক দুপুরে,
তিনটে পঞ্চাশের এক্সপ্রেস বেরিয়ে যাওয়ার সময় হরপ্রসাদের ম্যাসিভ কার্ডিয়াক অ্যাটাক
হয়। সেদিন ছিলেন ঝাঁকড়া একটা নিমগাছের ঠিক নিচে। মাঠের একদম কেন্দ্রে। বিছানো
শীতলপাটির ওপর কাৎ হয়ে পড়ছিলেন ।
কাকতালীয়ভাবে যার শেষ লাইনটা ছিল মৃত্যু-বিষয়ক-‘পোকার মৃত্যুতে অন্য পোকারা কাঁদে
?নাকি, অন্যরা আনন্দের সঙ্গে তাকে খেয়ে নেয় ?’ সবাই টের পায় পরে। সুস্মিতার
তারস্বরে কান্নায় । মুনিষরা এসে দেখে রঙবেরঙের পোকার দল হেলে পড়া শরীরে উঠে পড়েছে
। পা থেকে ঘাড় অবধি লম্বা মিছিল । ভাঙা খেলনা গাড়ির মতো দেখাচ্ছিল বাবুর শরীরটা ।
সুস্মিতাকে ছেঁকে ধরেছিল পিঁপড়ে। ফর্সা মেয়ে ফুলে লাল হয়ে যায়। দুজনকে তাড়াতাড়ি তুলে
বাড়ি নিয়ে যাওয়া হলেও ডায়েরিটা পড়ে রইল কেঁচোর কুণ্ডলী পাকানো একটা গর্তের ওপর।
খোলা পাতায় বসেছিল গুবরে পোকা । মৃদুমন্দ বাতাসে পাতাগুলো তার গায়ে পড়ছিল ঝালরের
মতো , আর সে চমকে চমকে উঠছিল । গাছের মাথায় হঠা পাখিদের ভিড় লেগে যায়। তখন বিকেল
চারটে ছাপান্ন ।
মৃত্যুর কিছু আগে নিজের লেখা থেকে
হরপ্রসাদ একটা চিরকালীন সত্য আবিষ্কার করেন । মানুষ নিয়ে তিনি লিখতে চাননি , অথচ ,
সারাজীবন ছোট ছোট প্রাণের মধ্যে মানুষের বৈচিত্র্যই খুঁজে বেড়িয়েছেন । মানুষ যাকে
ভুলতে চায় শেষ পর্যন্ত সে প্রবলভাবে অন্য আকারে তাকে তাড়া করে বেড়ায়।
হার্ট-অ্যাটাকের ঠিক আগে তিনি এটা উপলব্ধি করেন । তখন সময় ফুরিয়ে এসেছে । সে সময়
ছেলের কথা মনে পড়ে- না, ছেলেটার ওপর অবিচার করাই হয়ে গেছে । এরপর একবার সুস্মিতার দিকে
তাকান এবং কাৎ হয়ে পড়েন ।
সব ডিটেল সুস্মিতার মনে থাকার কথা নয়
। তবু সাত বছরের কিছু কিছু থেকেই যায় । পোকার সারিবদ্ধ মিছিলে চাপা পড়া স্নেহপরায়ণ
ঠাকুরদার নিঃসাড় শরীরের কথা আর পিঁপড়ে আক্রান্ত নিজের অসহায় জ্বালা ধরানো অবস্থার
অনুভূতি তার মনে রয়ে গেল স্থায়ীভাবে । আর এ সবকে ছাপিয়ে রয়ে গেল একটা রসালো নোনতা
স্বাদ , বাঁচার তাগিদে পিঁপড়ে চিবিয়ে ফেলে যা সে পেয়েছিল । ঐ স্বাদ কখনও তার পিছু
ছাড়েনি। বাকি জীবন স্বাভাবিক যৌনতার প্রধান বাধা হিসেবে সঙ্গে রয়ে গেল । চুম্বন,
ফাটা ঠোঁটের রক্ত, লালা, ঘাম, সব ধরণের শারীরিক নিঃসরণে সুস্মিতা পেত পিঁপড়ের
নোনতা রস আর সেই সঙ্গে তার চোখের ওপর ভেসে উঠত একটা দুঃখের ছবি – নানা শেডের
সবুজের মাঝে ছুটে যাওয়া ট্রেনের সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছে তার জীবনের ফার্স্ট পার্সন ,
তার প্রথম বিন্দু, শ্রীযুক্ত বাবু হরপ্রসাদ ।
(... চলবে )
No comments:
Post a Comment