নিরবতার
ত্রয়ী সম্পর্কে একটি খসড়া আলোচনা
থিওডোরাস এনজেলোপুলুস,গ্রিক
পরিচালক,দেশভাবনাকে যিনি প্রায় যাপনব্রত করে নিয়েছিলেন জন্মেছিলেন ১৯৩৫ সালের সাতাশে
এপ্রিল,এথেন্সে। তিনি সেই বিরল পরিচালকদের
একজন যারা সমস্ত সুখসুবিধা থাকার পরেও দেশে বসেই সিনেমা করেছেন আর বলেছেন নিজের দেশের দুর্দশার কথা, দেশের
ইতিহাসকে বিশ্বের ইতিহাসের সাথে মিলিয়ে
দেখার একটা প্রবণতা তাঁর ছিলো। বিশ্বের সিনেমা প্রেমিক
দর্শকদের তিনি দেখাতে চাইতেন গ্রীসের ভূদৃশ্য, মানুষজন ইতিহাসবিচ্যুত না হয়ে। এই পরিচালকের
জীবনব্যাপী কাজের একটা বড়ো দিক হচ্ছে, তিনি
গ্রীসের পুরনো পৌরাণিক পরিচয়টা থেকে বাস্তবিক পরিচয়কে নিয়ে এসেছিলেন মানুষের সামনে। তাঁর সিনেমার
চরিত্রদের কেউই অলিম্পাস পর্বতে থাকে না, থাকে
ক্লেদদীর্ণ দিনানুদিনেই, প্রায়ই তারা অতি সাধারণ মানুষ, শরণার্থী, একটু ভালো করে বাঁচতে চায়, একা হয়ে পড়েছে ভেতর থেকে, স্বপ্নে দেখা কোনো
পিতৃপ্রতীকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েছে হয়তো কেউ। ষাট দশকের গ্রীসের অবস্থা ভালো নয়। গ্রামের পর
গ্রাম খালি পড়ে আছে। বৃদ্ধ মানুষদের কথাও যাওয়ার
নেই বলে কেবল তারাই আছেন। তরুণ সমাজ গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছে শহর এথেন্সে অথবা ইউরোপিয়ান দেশগুলোয় মূলত জার্মানিতে। গৃহযুদ্ধের কোনো কোনো বেঁচে যাওয়া
সৈনিক ফিরে আসছে তিন দশক পার করে দিয়ে যাদের
সম্বল শুধুই স্মৃতি। আমরা বিবেচনা করতে পারি, পরিচালকের
নির্মিত প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটির কথা যার নাম ছিলো ব্রডকাস্ট, মুক্তি পেয়েছিলো ১৯৬৮
সালে। সেই সিনেমায় তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, বিজ্ঞাপনী
ব্যবস্থার বিপুল মোহের বিপ্রতীপে সেই ব্যবস্থার সাথেই সংযোগের সংকটের প্রকৃত চেহারা। মুখ
বিজ্ঞাপনে ঢেকে গেলেও আমরা মূক হয়ে থাকি, আবিষ্কার
করতে পারিনা বিজ্ঞাপনের সর্বগ্রাসী অবস্থার সামনে আমাদের আমিত্বকে এবং এইভাবেই একটা আত্মপরিচয়ের
দীনতা আমাদের গ্রাস করে। ১৯৭০ সালে
মুক্তি পেলো পরিচালকের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, রিকনস্ট্রাকশন। তাঁর সাক্ষাৎকার সংকলন থেকেই
আমরা জানতে পারি, পৃথিবীর সকল প্রথম সিনেমার পরিচালকের মতই তাঁকেও অনেক চড়াই উৎরাই
পেরোতে হয়েছিলো, এমনকি
কুশীলব নিয়োগের অর্থ ছিলো না বলে পরিচালক নিজেই অভিনয়ে নেমে পড়েছিলেন। তো, এই
চলচ্চিত্রের বিষয়টা কি আমরা যদি তলিয়ে দেখি দেখবো তিনি নিজের দেশের কথাই বলছেন যা খুব সহজেই
মিশে যাচ্ছে আমাদের বাস্তবতার সাথেও। এই
সিনেমায় আমরা দেখি, জার্মানিফেরত এক ভদ্রলোক তার স্ত্রী ও প্রেমিকের হাতে খুন হয়ে গেছেন। খুনের ঘটনাটি
একবারও দেখানো হয় না কেননা তখন গ্রীসের
সিনেমাহলসমূহ দখল করে রাখা আরেকটি বাজারচলতি ছবি তিনি নির্মাণ করতে চাননি। খুনের ঘটনাটি তাঁর
চলচ্চিত্রের উপরিতলের ঘটনা মাত্র, কোনো
একটা সিনেমায় জুড়ে দেয়া একটা খুনের গল্পই সেটা কিন্তু সেটিই আসল কথা নয়, তিনি এর মাধ্যমে তুলে
ধরেন সারা গ্রীসের গ্রামগুলোর পরিস্থিতি। পুরো
সিনেমা জুড়েই চলে তদন্ত এবং তার ভেতর দিয়েই সত্য তুলে ধরেন তিনি। সত্যটি বহুস্তরীয়। এই চলচ্চিত্র
যিনি দেখবেন তিনি উপলব্ধি করবেন, আমাদের দেশের
বাস্তবতাও এর বাইরে নয়। থিও নিজেই বলেছেন, ’অর্থপূর্ণ
হচ্ছে সেই যাত্রা যা কিনা ইতিহাস ও ভূদৃশ্যের
সমান্তরালে বয়ে চলে।’ আমরা এখন তাঁর দ্বিতীয় ট্রিলজি নিয়ে কিছু কথাবার্তা বলবো।এই ট্রিলজির নাম দেয়া হয়েছিলো, ট্রিলজি
অফ সাইলেন্স। এই ত্রয়ীর তিন সিনেমার
নাম হচ্ছে-ভয়েজ টু সাইথেরা, দ্য বিকিপার এবং ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট। তিনটি সিনেমাই
যাত্রার গল্প বলে। প্রথম সিনেমা ভয়েজ টু
সাইথেরাতে ফিরে আসা বিপ্লবী বাবা স্পাইরোসের যাত্রা নিজের অতীত আর বর্তমানের ভেতর সংযোগচেষ্টার ভেতর, দ্য
বিকিপারে স্কুলশিক্ষক বাবা নিজের ভেতরেই
যেন যাত্রা করেন নিজের মৌমাছিপালনের বাক্সগুলোকে সাথে নিয়ে আর তৃতীয় সিনেমা ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্টে
দুই ভাইবোনের যাত্রা নিজেদের বাবার কাছে
যাওয়ার যিনি আসলে নেই। ধরণের দিক থেকে এই তিনটি সিনেমাই ‘রোড মুভি’, ভিম বাইন্ডার্সের এলিস ইন দ্য সিটি, দ্য
রঙ মুভ আর কিংস অফ দ্য রোড- ত্রয়ীটি যেমন।
ভয়েজ টু সাইথেরায়
আমরা দেখি,
প্রথমে রাস্তার জমে থাকা জলে পড়ে লোকটির ছায়া, বত্রিশ বছর পর যে কিনা নিজেই ছায়া হয়ে গেছে। স্পাইরোস, আলেকজান্দ্রোস-ভৌলা-নিকোর
হলেও হতে পারে বাবা, ফিরছেন নির্বাসন থেকে। ভৌলা ভাইকে বলছে-‘তুমি একটা জিনিস জানো? লোকটা আমাদের বাবা হতে পারে কিন্তু বত্রিশ বছর বাদে এর কি কোনো
মানে দাঁড়ায়?’- এই কথাটার পরেই বোন আরো
বলে-‘কেন আমাদের একটা ছায়ার পেছনে দৌড়ানো উচিত?’... এসব কথার ভেতর বাবা এসে বলেন-‘এই তো
আমি’। বাবাছেলের সংলাপ দেখি তারপর-
ছেলে। কি হলো?
বাবা। আমি ভয় পাচ্ছি।
ছেলে। সে (মা) তোমার
পথ চেয়ে বসে আছে।
বাবা। তার চোখের রঙ
কি?
তারা বাড়ি ফিরেছেন। তাঁর
স্ত্রী এতো বছর পর তাঁকে দেখে প্রশ্ন করেন- ‘তুমি খেয়েছো?’... যে কোনো দর্শক এই সিনেমার
নয় কেবল থিওর বাদবাকি সকল সিনেমার সংলাপের অতি
অল্প ব্যবহারে অবাক হবেন, আবিষ্কার করবেন তাঁর সিনেমায় নিরবতা কত বাঙ্ময় ! স্পাইরোসের তারপর আত্মীয়স্বজনদের
সাথে দেখা হয় কিন্তু তিনি এখানেও তীব্র
নির্লিপ্ত। গ্রামের কবরস্থানে গিয়ে তিনি মৃত আর স্মৃতিতে লীন বন্ধুদের ডাকতে থাকেন-
হে গিওরগিস
হেলো দেয়ার, লেনি
হে, দিমিত্রি
দর্শক হিসেবে আমাদের
সবকিছু তখন ভেঙেচুরে যেতে থাকে কেননা এইসত্য আমরাজেনে উঠি এমনকি নির্বাসনকালের
যন্ত্রণাতেও বিপ্লবী তাঁর বন্ধুদের বিস্মৃত হননি। তখন
তাঁর সাথে থাকা একজন বন্ধু বলেন- ‘তারা পারলে আকাশটাকেও বিক্রি করে দিতো।’ তাঁরা তাঁদের তারুণ্যের গান
গাইতে থাকেন- ‘চল্লিশটি লাল আপেল, ও প্রিয়তমা, রুমালে
বেঁধে রাখা।’ সিনেমার গল্পের এই পর্যায়ে আমরা দেখি একটি সংস্থা
কিনতে চায় পাহাড়ের সব জমি, তারা সেখানে একটা হলিডে রিসোর্ট করতে চায়। কেবল স্পাইরোস প্রত্যাখ্যান করে এই
প্রস্তাব। তাঁর মেয়ে ভৌলা তাঁকে বলে-‘তুমি
আর তোমার প্রজন্ম কখনোই অন্য মানুষকে চিন্তা করার অবসর দাওনি। তুমি পাহাড়ে গিয়ে যুদ্ধ করে পালিয়ে
গিয়েছো। ফিরলে কেন?’ – বাবা নিরুত্তর থাকেন। রাতে তারা যখন সপরিবারে
খেতে বসে প্রতিবেশীরা দল বেঁধে আসে
স্পাইরোসকে জমি বিক্রিতে বাধ্য করতে কিন্তু তিনি স্থির, অটল
ও অচঞ্চল। এক প্রতিবেশী
চিৎকার করে বলে- ‘স্পাইরোস! তুমি মৃত... খতম হয়ে গেছো... তোমার অস্তিত্ব নেই... তুমি তো তোমার
বন্দুক নিয়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছো... তুমি মৃত, স্পাইরোস!’
একজন মাত্র বন্ধু যে থেকে গিয়েছিলেন আরো খানিকটা সময় গান গেয়ে ওঠেন, তাঁদের বিপ্লবদিনের
গান- ‘যদি আমাকে মরতেই হয় তবে তাই
হোক... আমি যেন হাতে বন্দুক নিয়েই মরতে পারি।’ স্পাইরোস বত্রিশ
বছর পর ফিরেছেন, কমিউনিস্ট হবার কারণে নির্বাসন ভোগ করেছেন প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ
উজবেকিস্তানের তাসখন্দে। পরিচালক আমাদের দেখান, এই বিপ্লবী দেশের
অতীতের প্রতিনিধিত্ব করেন আর গ্রামবাসীদের
কাজকর্ম আমাদের জানায়, দেশ এখনো অতীতের সাথে সমঝোতায় রাজী নয়। একজন পুরনো কমরেড বলছিলেন, ‘তারা
আমাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। মানুষের
বিরুদ্ধে মানুষকে, নেকড়ের বিরুদ্ধে নেকড়েকে। এখন সবই ধ্বংস হয়ে গেছে।’ প্রিয় পাঠক, আপনাকে
একটা চমৎকার বই পাঠের পরামর্শ দিতে পারি। আমাদের
দেশের সেবা প্রকাশনী এর সুন্দর এক অনুবাদ করেছিলো। বইটির নাম- ইলেনি। লিখেছেন, নিকোলাস গেজ। গ্রীসের
এই সময়টাকে জানবার জন্য আত্মজীবনীমূলক এই
উপন্যাস প্রায় অবিকল্প। বইটা আমাদের জানায়, গ্রিক গৃহযুদ্ধ
গ্রামগুলোকে আক্ষরিক অর্থেই ছিঁড়ে ফেলেছিলো। ১৯৪৮ সালে, গ্রীসের পাহাড়ী গ্রামে, ইলেনি
গ্যাটজোইয়ানিসকে কমিউনিস্ট গেরিলারা বন্দী করে নির্যাতন করে
এবং গ্রামের প্রতিবেশীদের বাধ্য করে তাকে গুলি করে মারতে। ইলেনি ছিলেন গ্রীসের গৃহযুদ্ধের ১,৫৮,০০০ শিকারের একজন মাত্র। তাঁর অপরাধ ছিলো, গ্রামের শিশুদের গেরিলাদের হাত থেকে রক্ষা
করা। লেখক নিকোলাস গেজ ছিলেন ইলেনির আট বছর বয়সী
সন্তান। এনজেলোপুলুসের
অন্যান্য সিনেমার মতোই ভয়েজ টু সাইথেরা হোমারের অডিসির একটা ধরণ। ওডিসির চরিত্রগুলোর মতোই, স্পাইরোস
নিজের ইথাকা ও পেনেলোপের কাছে ফেরেন, এই
ক্ষেত্রে ক্যাথারিনের কাছে। হোমারের সাথে থিও মূলগত জায়গায় আলাদা, প্রাচীন গ্রিক লেখকের ওডিসিয়ুস আর পেনেলোপে
ছিলো শয্যায় অবিচ্ছিন্ন আর এইখানে
স্পাইরোসের কোনো নিজের জায়গা নেই। কোনো জাতীয়তা নেই। আবার তিনি নির্বাসিত হতে বাধ্য হন আন্তর্জাতিক
জলসীমার দিকে। বৃষ্টিমগ্ন দিনে ডকশ্রমিকরা
আনন্দরত,
এমনকি যুগলের অস্থানে সঙ্গমও নির্বিঘ্ন-এই পরিস্থিতিতে মঞ্চে উঠে ক্যাথারিন জানান দেন, ‘আমি
তাঁর সাথে থাকতে চাই’। সিনেমার শেষ দৃশ্যে আমরা দেখি, বয়স্ক দম্পতি
সমুদ্রের অন্তহীনতার দিকে, আমাদের
দিকে পেছন ফিরে ভেসে যাচ্ছেন। ক্যামেরা অতি ধীরে পিছিয়ে আসে, তাঁরা ছোটো হতে হতে মিলিয়ে যাবেন এক সময়-
দিগন্তবিস্তারী জলাশয়ে। খুবই প্রাসঙ্গিক
ছিলো এই সিনেমা যখন ১৯৮৪ সালে প্রথম দেখানো হয়েছিলো তখন কেননা ১৯৮৩ সালের দোসরা জানুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমসের
রিপোর্ট জানায়-‘ গত সপ্তাহে সমাজতন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রিয়াস পাপানদ্রিউ বেঁচে
যাওয়াদের ভেতর তিরিশ হাজার
নির্বাসিতকে দেশে ফেরার আমন্ত্রণ জানিয়ে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলেন।’
দ্য বিকিপার সম্পর্কে
থিও বলেছিলেন-‘ আমরা চাই, খুব আন্তরিকভাবেই চাই, আমাদের চারপাশের পৃথিবীটা বদলে যাক কিন্তু
আমরা জানি না কখন বদলাবে। ইতিহাস এখন
নিরব আর নিজেদের ভেতরটাকে খুঁড়েই আমরা উত্তর পেতে চাইছি কেননা নিরবতার ভেতর বাস করা ব্যথাতুরভাবেই অসহ্য।’ দ্য বিকিপার হলো একজন অত্যন্ত একলা মানুষের গল্প যার বলবার মতন
কোনো কথা নেই, যে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না। একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ যিনি
স্কুলশিক্ষক ছিলেন, মেয়ের বিয়ের দিন
স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে, স্ত্রীকে ছেড়ে, শহর ছেড়ে তাঁর মৌমাছিপালনের বাক্সগুলোকে নিয়ে মৌমাছিরক্ষকদের
ঐতিহ্যবাহী বসন্তকালীন রাস্তার মানচিত্ররেখা
ধরে তিনি বেরিয়ে পড়েন পুষ্পসন্ধানে যাদের মাধ্যমে সেরা মধু হতে পারে। একই কাজ করেছিলেন তাঁর বাবা দাদারাও।
তিনি তাঁর জন্মকালীন শহর থেকে
প্রথম মৌমাছিপালন শিক্ষার এলাকায় ঘুরে বেড়ান। স্মৃতির ভেতরকার পুরনো উপাদান ফের এসে হাজির হয় এই শহর
থেকে শহর ঘোরার সময়ে। চলতিপথে দ্রুত বদলাতে
থাকা নানা চিহ্নের সামনে তাঁকে পড়ে যেতে হয় এবং এই চিহ্নেরা তাঁকে ক্লান্ত ও বিপন্ন করে তোলে। তিনি চলতি পথে
এক তরুণীকে গাড়িতে আশ্রয় দেন যে
তরুণী বর্তমানে বাঁচে যেন মেয়েটির কোনো স্মৃতি, বেদনা বা অনুশোচনা কিছুই নেই। এই তরুণী এমন এক
প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে যার কিছুতেই কিছু
এসে যায়না। এই প্রজন্ম মেমোরিহারা, অতীত সম্পর্কে মমতাবিনা প্রজন্ম, কেবল এক জায়গা থেকে আরেক
জায়গায় ভেসে বেড়াচ্ছে, মোটর গাড়ির আলোজ্বলার মধ্যবর্তী বিরতি-গ্যাস স্টেশনের একাকীত্ব- রাতের
খাবারের হইচই বর্তমান গ্রিসের
ভেজা পিচ রাস্তার পাশের অন্ধকার সস্তা হোটেল আর ট্রাফিক সিগনালের ভেতর তারা, এই প্রজন্মটি বেড়ে
উঠছে। থিও বলেন, এটা স্মৃতি ও
স্মৃতিহারার ভেতরকার যুদ্ধ যাদের কেউই হার স্বীকার করতে রাজি নয়। মধ্যবয়স্ক মানুষটির নাম স্পাইরোস, আগের
সিনেমার মূল চরিত্রের মতনই। থিওর সিনেমায়
বার বার ঘুরে আসা এই নামটি তাঁর বাবার নাম যে বাবা বিষয়ে নয় বছরের বালক গুজব শুনেছিলো, তাঁকে
মেরে ফেলা হয়েছে। অইটুকু একটা বাচ্চা, শত শত লাশের ভেতর নিজের বাবাকে খুঁজতে গিয়েছিলো।
এই অনুসন্ধানের ট্রমা থেকে থিও সারাজীবনেও মুক্ত
হতে পারেননি যদিও সে যাত্রায় বাবাকে জীবিত অবস্থায় ফিরে পাওয়া গিয়েছিলো। এই সিনেমার স্পাইরোস ঘুরে বেড়ায়
নিজের অতীতের ভেতরেই। চরিত্রদের
নিজেদের অতীত মানে থিওর ছবিতে প্রায়ই দেশেরও অতীত। কেননা দুটি মহাযুদ্ধের মাঝখানে জন্মে যাওয়া থিও সবসময়েই
নিজস্ব ইতিহাসের শিকড়ে পৌঁছাতে
চেয়েছেন, তাঁর প্রতিটি সিনেমায়
অলংকরণ আর পটভূমি তৈরি করে গ্রীসেরই ইতিহাস।
তরুণীর সাথে
মধ্যবয়স্ক লোকটির যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে সেই সম্পর্কের কোনো নামকরণ হয় না। এবং এই বিনাঅতীত নতুন প্রজন্মের
মেয়েটিও তাঁর একাকীত্ব দূর করতে পারে না।একলা, স্তব্ধ
আর বর্তমানের সাথে কোনো ধরণের সংযোগপ্রকল্পে যেতে না পারা মানুষটি এক সকালে তাঁর মৌমাছিপালনের
বাক্সগুলোর কাছে যান এবং সব মৌমাছিকে
মুক্ত করে দিয়ে নিজেকে উন্মুক্ত করে দেন এদের আঘাতের সামনে।ক্যামেরার ঘোরা সাঙ্গ
হবার সময় পর্দায় দেখা যায় আহত হাত অস্থির, নিজেই
আঘাত সয়ে নিতে চাইছেন, হতে চাইছেন নীলকন্ঠ আর ক্যামেরার চোখ আমাদের দেখায় খোলা আকাশ আর উড়ন্ত মৌমাছি।
এই ট্রিলজির শেষ
সিনেমার নাম ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট, পরিচালকের অন্যতম সেরা সিনেমা। এই চলচ্চিত্রটি দর্শককে একেবারেই
স্বস্তি দেয় না। এ এক অন্যতর যাত্রার গল্প।
আলেকজান্ডার হচ্ছে ভাই( খেয়াল করবার মতন, আগের সিনেমায় স্পাইরোসের পুত্রটির একটি কাছাকাছি
নাম ছিলো) যে কিনা প্রতিরাতে ট্রেন
স্টেশনে যায় জার্মানির দিকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেন দেখতে। আলেকজান্ডার ও তার দিদি বিশ্বাস করে তাদের বাবা সেখানে
থাকেন। অন্ধকারে দিদি তাকে প্রতিবারের মতন বলা
গল্পটা আরেকবার বলে- ‘ শুরুতে ছিলো অন্ধকার... আর তারপরেই আলো এলো। এবং আলোকে বিচ্ছিন্ন করা হলো
অন্ধকার থেকে... এবং পৃথিবীকে সমুদ্র
থেকে...এবং নদীগুলোকে, হ্রদগুলোকে... এবং পাহাড়গুলোকে তৈরি করা হয়েছিলো এবং তার পর পুষ্পরাজি আর গাছ...
পশুদের... পাখিদের।...গল্প
অসমাপ্ত থাকে।’ এই সাধারণ দৃশ্যের পটভূমি প্রায়ান্ধকার, ভাইবোন তৈরি হচ্ছে নিজেদের যাত্রার জন্যে, তারা তাদের উৎস খুঁজে
পেতে চায় যে উৎসের শেষে কখনো
না দেখা বাবা। ছবিটা শুরু হয় অন্ধকারে এবং শেষ হয় আলোতে। এক রাতে তারা সীমান্তগামী ট্রেনে উঠতে সক্ষম
হয়। যাত্রায় একাধিক বিপদ আর
সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, কিছু আশা আর ভালোবাসা যে ছিলো না তা নয়। ট্রেন থেকে লুকিয়ে নেমে পড়ে তারা ভ্যানে, লরিতেও যাত্রা করে, এই যাত্রার গল্প বলতে বলতে নিজের অন্যান্য সিনেমার মতই
থিও আমাদের দেখান তাঁর মাতৃভূমি গ্রীসের প্রকৃতি-
পরিত্যক্ত সৈকত, অন্ধকার বৃষ্টির জলজমা রাস্তা আর দক্ষিণ গ্রীসের ক্যাফে। এই সিনেমায়
অবিস্মরণীয় অজস্র দৃশ্য আছে। যেমন এক দৃশ্যে
আমরা দেখি ছেলেমেয়েরা একটা রেলস্টেশন থেকে বের হচ্ছে, ব্যাকগ্রাউন্ডে থিওর সব সিনেমার সংগীত পরিচালক
ইলিনা কারানদুরুর হৃদয়স্পর্শী সুর, আমরা দেখি বিরাট
পাওয়ার স্টেশনের সামনে বামনসদৃশ ছেলেমেয়েদের, যেন তারা ফালতু, তারা কোথাও গুরুত্ব
বহন করে না। তারা একটা ভাঙাচোরা এলাকার ভেতর
দিয়ে দৌড়ায় আর তাদের সামনে দেখা যায় একটা অতি বিশাল মাটিকাটার যন্ত্র যেন সেটা কোনো বিজ্ঞান কল্পকাহিনি থেকে
উঠে এসেছে। রাস্তায় তারা থিওর
আগের সিনেমা দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ারের ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত অভিনেতাদের সাথে দেখা হয় যারা কিনা এতো বছর পর
দলটাকে টিকিয়ে রাখতে পারছে না।
ওরেস্তেস ( যে কিনা ট্রাভেলিং প্লেয়ারে শিশুশিল্পী ছিলো ) তাদেরকে বলে- ‘ তারা বিষণ্ণ। সময়
বদলে গেছে। সব কিছুই বদলে গেছে। আর সময়ের দ্বারা
আহত এরা ঘুরে বেড়াচ্ছে গ্রীস জুড়ে... সবসময় একই নাটক করে যাচ্ছে।’ আশি সালের গ্রীসে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের আর কোনো
ভূমিকা নেই। এই দলটির কাছে যে
ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্নিত কাপড়ে আঁকা দৃশ্যগুলো আছে তারও কোনো মূল্য এই পাল্টে যাওয়া গ্রীসের কাছে নেই।
আমরা ভয়েজ টু সাইথেরা সিনেমায় দেখানো
বামপন্থী অতীতের সাথে এর একটা সম্পর্ক সহজেই খুঁজে পাবো। আরেক দৃশ্যে দেখি সমুদ্র থেকে উঠে আসা হাত
নিয়ে যাচ্ছে হেলিকপ্টারে, এটা মার্বেল
পাথরে নির্মিত হাত যা কিনা গ্রীসের ধ্রুপদী অতীতের চিহ্ন যার কোনো মূল্য নতুন গ্রীসে নেই। পরিচালকের প্রিয়
কবি জর্জ সেফেরিসের কবিতাতেও পাই –
‘আমি
হাতে এই মার্বেলের হাতটা নিয়ে জেগে উঠছি;
আমার কনুই ক্লান্ত আর
আমি জানি না
কোথায় রাখবো এটাকে।
স্বপ্নের ভেতরে পড়তে
থাকে এই হাত যেন আমিই
বেরিয়ে আসছি স্বপ্নটা
থেকে, আমাদের জীবন তাই
একাকার
আলাদা করা যাচ্ছেই
না।
আমি চোখের দিকে তাকাই; বন্ধ বা খোলা নয়
আমি মুখের সাথে কথা
বলি যে কিছু বলতে চায়
আমি চিবুক তুলে ধরি
যার চামড়া অব্ধি ভাঙা।
এর বেশি আর কিইবা
করতে পারি।
আমার হাতেরাও বারবার
অদৃশ্য হয়
আর বিরতিহীন ফিরে
ফিরে আসে।
(জর্জ
সেফেরিসের মিথিস্তোরেমা থেকে)
এই কবিতাই হলো
সিনেমাটার আত্মা যা কিনা এন্ড্রু হর্টনের ( যিনি থিওকে নিয়ে দুটো প্রবন্ধের বই সম্পাদনা করেছেন, থিওর সিনেমাগবেষক )
বরাতে আমরা জানতে পারি।
দুটো দৃশ্যের কথা বলা
যাক। একটা দৃশ্যে, ভাইবোন একটা বিয়ের দৃশ্য দেখছে শহরের একটা ক্লাবে... তখন একটা ট্রাক্টর টেনে
নিয়ে আসে এক মরণাপন্ন ঘোড়াকে। ভাই এই
দৃশ্যের চাপ নিয়ে পারেনা, সে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে। পরিচালক পরে বলেছিলেন এক সাক্ষাৎকারে, নিজের বোনের
মৃত্যুবেদনাই তিনি এই দৃশ্যে ফিরিয়ে
এনেছেন। আরেকটা দৃশ্যে, ভৌলা ট্রাক ড্রাইভার কর্তৃক ধর্ষিত হয়। পরিচালক দৃশ্যের ভয়াবহতা
দেখান কোনো ভায়োলেন্স না দেখিয়েই। বোন ট্রাকের পেছন
থেকে বেরিয়ে আসে। প্রথমে পা দেখি আমরা। আর তারপর হাতের মুঠো খোলে। রক্ত ঝরে পড়ে। থিও আমাদের জানান, এই সিনেমাটা কেবল
বাবাকে খুঁজে বেড়ানোর গল্প নয়। জীবন
আমাদের যা শেখায় এই যাত্রার ভেতর দিয়ে নির্মল ভাইবোনদের
সেসবের মুখোমুখি হতে হয়। এক নিরব শহরে
ওরেস্তেসের সাথে হাঁটতে হাঁটতে সে কুড়িয়ে পায় এক টুকরো ৩৫ মিমি ফিল্ম। সে আলোর দিকে ধরে এটা, আমরা দেখি এটা খালি
কিন্তু ছোটো
ভাইটিকে সে বলে- ‘ কুয়াশার পেছনে...
অনেক দূরে... তুমি কি একটা গাছ দেখতে পাচ্ছো না?’ তাদের যাত্রার শেষে তারা সীমান্তের কাছে আসে।
অন্ধকারে নদী পার হয়। সীমান্ত রক্ষীদের দিক
থেকে ভেসে আসে গুলির শব্দ। ভোরে কুয়াশায় ভাইবোন জেগে ওঠে। ভৌলা বলে, সে ভয় পাচ্ছে আর তখন ভাই বোনকে সেই শুরুর
গল্পটা শোনাতে থাকে-‘ সব কিছুর শুরুতে ছিলো
অন্ধকার... আর তারপর আলো এলো।’ দূরে একটা গাছ দেখা
যায় কুয়াশায়। আর ওরা গাছটাকে জড়িয়ে ধরতে ছুটে যায়।
এই গাছটাই আশার
একটা প্রতীক, তাদের জন্য আর আমাদের জন্যেও।
বেশ ভাল লাগছে। সৈকত দের লেখাটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ও মনোগ্রাহী। এই উত্তম উদ্যোগের জন্য সকলকে সাধুবাদ এবং সাফল্যের জন্য শুভকামনা রইল।
ReplyDelete