এবং সাক্ষাৎকার
।। ১ ।।
খুব ভোর। গ্রীষ্মের ভোর যেমন
হয়। সাড়ে চারটে-পৌনে পাঁচটা নাগাদ। শালজঙ্গলে ঘাসের ওপর দিয়ে একটা সুবৃহৎ মাকড়সা
চলেছে। আর কোনও শব্দ নেই চারপাশে। ধীরে-ধীরে পাখির ডাক জেগে ওঠে এরকম সময়েই। আলো
ফুটছে।
ভয়েস ওভার :
‘আমাকে এখানে সাড়ে চার লাইনের একটা টেক্সট
দেয়া হয়েছে। তার
বাঁ পাশে লাল মার্কার দিয়ে ফার্স্ট ব্র্যাকেটে ইংরিজিতে লেখা ভয়েস ওভার।
টেক্সটটা একবার পড়ে দেখলাম। খুবই বাজে লেখা। আমার পড়তে ইচ্ছে করছে না। আর তাছাড়া, মুডটাও ভালো নেই আজকে।’
।। ২ ।।
গ্রীষ্মের ভরা দুপুর। খটখটে
রোদ। শালজঙ্গল। সেখানে একটা খাট পাতা। কালো চাদর বিছানায়। গেরুয়া পাঞ্জাবি পরে
লেখক বসে আছে সেখানে। নেপথ্যে ঝুমিয়ে বৃষ্টির শব্দ। কিন্তু পর্দায় দেখা যাচ্ছে
গ্রীষ্মের রোদ।
‘একজনের আসার অপেক্ষা করছি। এখানে আসতে বলেছি
তাকে। ভোরবেলা আসার কথা। এখনও তো এল না। চিনে আসতে পারবে তো?’
প্যাকেট থেকে সিগারেট বের
করে। ধরায় না। নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শোঁকে। হাতে ধরে বসে থাকে।
‘ডাক্তার আমাকে সিগারেট খেতে নিষেধ করেছেন।
একেবারেই বন্ধ। ছাড়ারও একটা উপায় বলেছেন। তার কথা শুনেই সিগারেট কিনছি। কিন্তু
দেশলাই কিনছি না। যখন খেতে ইচ্ছে হয়, হাতে নিয়ে গন্ধ শুঁকি।’
।। ৩ ।।
কলকাতার বড়ো কোনও ফাঁকা
রাস্তা। বন্ধের বিকেল। আশপাশে উঁচু অট্টালিকা। রাস্তায় একটা খাট পাতা। কালো চাদর
বিছানায়। লেখক বসে আছে সেখানে। নেপথ্যে সমুদ্রের শব্দ।
‘একজনের আসার অপেক্ষা করছি। এখানে আসতে বলেছি
তাকে। দুপুরে আসার কথা। এখনও তো এল না। চিনে আসতে পারবে তো?’
সিগারেটের প্যাকেট কানের
কাছে নিয়ে ঝাঁকাচ্ছে।
‘ডাক্তার আমাকে সিগারেট খেতে নিষেধ করেছেন।
একেবারেই বন্ধ। ছাড়ারও একটা উপায় বলেছেন। তার কথা শুনেই সিগারেট কিনছি। কিন্তু
দেশলাই কিনছি না। যখন খেতে ইচ্ছে হয়, প্যাকেটটা নিয়ে কানের
সামনে ঝাঁকাই। সিগারেটের নড়াচড়ার শব্দ শুনি।’
‘সমুদ্রের আওয়াজ পাচ্ছেন তো? এটা তৈরি করা শব্দ নয়। কলকাতার নিজেরই শব্দ। ঊনিশ শতকের গোড়ায় কলকাতায়
যেসব গভীর পুকুর খোঁড়া হয়েছিল, তার নিচ থেকে পাওয়া যেত
কচ্ছপের খোল, নদীর বালি, সুন্দরী গাছের
শেকড় আর ঝিনুক। সমুদ্রের পেট থেকে উঠে আসা একটা শহর, এখনও
কান পাতলে তার অতৃপ্ত আত্মার হাহাকার শোনা যায়।’
।। ৪ ।।
সমুদ্র তট। সন্ধের একটু আগে।
একটা খাট পাতা। কালো চাদর বিছানায়। লেখক বসে আছে সেখানে। নেপথ্যে কলকাতার রাজপথের
শব্দ।
‘একজনের আসার অপেক্ষা করছি। এখানে
আসতে বলেছি তাকে। বিকেলে আসার কথা। এখনও তো এল না। চিনে আসতে পারবে তো?’
সিগারেটের প্যাকেটের
প্লাস্টিকের কাভার আর ভেতরের রুপোলি রাংতা বের ক’রে একটা পুঁটলি বানাচ্ছে।
‘ডাক্তার আমাকে সিগারেট খেতে নিষেধ করেছেন।
একেবারেই বন্ধ। ছাড়ারও একটা উপায় বলেছেন। তার কথা শুনেই সিগারেটের খালি প্যাকেট
জমাচ্ছি। ছোটবেলায় বাবা একটা গল্প বলতেন আমায়। এই যে পুঁটুলিটা বানালাম, এটা রাজপুত্তুরের পুঁটুলি। এতে আছে ছোলা, গুড়,
আখরোট, বাদাম, কিসমিস। রাজপুত্তুর
দূরে যাবে শিকারে। সঙ্গে নেবে পুঁটুলি।’
‘শহরের শব্দ শোনা যাচ্ছে না? এটার ব্যাখ্যাটা আমি দেব না। আপনারা খুঁজে দেখুন।’
পরপর কয়েকটি শট। যাতে
অপেক্ষা করাটা ধরা হয়। একটু পরে দেখা যায় লেখক ঘুমিয়ে পড়েছে। সমুদ্র তটে। বিছানায়।
খোলা আকাশের নীচে।
স্বপ্ন দেখছে। একটা নদীতে
ডিঙি নৌকোয় সে বসে আছে। খুব ভোর। তার সঙ্গে একজন সাংবাদিক (মহিলা)। শরীরে
এবং চোখে আবেদন আছে। ঢাকাই শাড়ি পরা। পুরনো দিনে বাঙালি মেয়েরা যেভাবে শাড়ি পরতেন। হাতে, কানে, নাকে
সোনার অলঙ্কার। ক্রমশ ভোরের আলো ফুটছে। চারপাশে এবং এদের মুখে আলোর সেই
ক্রমপরিবর্তনশীল রূপ।
সাংবাদিকঃ আপনার সাক্ষাৎকার নেবার কথা
ছিল আমার। দেরি হয়ে গেল। আসলে দেরি নয়, আপনাকে খুঁজতে শালবাগানে গেছিলাম। আপনাকে
তো পেলাম না। সিগারেটের প্যাকেটটা ফেলে এসেছিলেন। কুড়িয়ে এনেছি। সেখান থেকে কলকাতা
গেলাম। ওখানেও পেলাম না। ওখানেও আপনি সিগারেট ফেলে এসেছেন। তারপরে সমুদ্রে গেলাম।
সেখানেও নেই। আমি কিন্তু দেরি করিনি। ভোরবেলা আসব বলেছিলাম। দেখুন
এখনও সূর্য ওঠেনি।
লেখকঃ ঠিকই আছে। দ্য
আয়রনি অফ লাইফ ইজ দ্যাট ইট ইজ লিভড্ ফরওয়ার্ড বাট আন্ডারস্টুড ব্যাকওয়ার্ড। তুমি
তাহলে সাংবাদিক? জানো তো, যদি তুমি একগুচ্ছ সত্যি বলতে বলতে একটা
ডাহা মিথ্যেতে গিয়ে পৌঁছাও তবেই তুমি একজন সাংবাদিক হবে।
সাঃ আপনি যদি একের-পর-এক মিথ্যে
বলতে বলতে একটা সত্যতে উপনীত হন তবে আপনি একজন গল্পকার। ফিকশন লেখক।
লেঃ আমরা একসাথে থাকলে জগৎটা কত
পূর্ণ মনে হবে, না?
সাঃ আপনি কুড়ি বছর কবিতা লিখে
হঠাৎ ছেড়ে দিলেন কেন?
লেঃ হঠাৎ তো ছাড়িনি। হঠাৎ বলে
কিছু হয় না। আমরা যখন কোনও লজিক খুঁজে পাই না, তখন বলি হঠাৎ হয়েছে। এই যে ধরো, তুমি আমার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছ, সাক্ষাৎকার নেবে
বলে এত ঘুরেছ। এটা যদি লজিক হয়, তবে এই দ্যাখো এরকম ভোরবেলা
নদীর ওপর নৌকোয় তুমি এত সেজে বসে আছ, এবং আমার সাক্ষাৎকার
নিচ্ছ, এটা অ্যান্টি-লজিক। আমাদের মস্তিষ্কের যে অস্বাভাবিক
গঠন সমস্ত জীবজগৎ থেকে আমাদের আলাদা করেছে, তার সবচেয়ে বড়
জায়গা বোধয় গদ্য। সে লজিক, অ্যান্টি-লজিক দুটো নিয়েই একসাথে
কাজ করে। সেখানে কবিতা প্রায় পুরোটাই ইনসাবস্ট্যানশিয়াল। এই কল্পনার যুক্তিকে আমি
বুঝব বলেই তো কবিতা লিখেছি। যাতে আমার গদ্যের হাত পাকা হয়।
সাঃ আপনি তাহলে গদ্য লিখবেন বলেই
কবিতা লিখেছেন?
লেঃ একদম। এবং কবিতাকে কবিদের
দলের বাইরে গিয়ে নিজের মতো ক’রে বুঝব বলেই কবিতা লেখা ছেড়েছি। আমের ভেতরে বসে কোনও পোকা
কখনও আমকে বুঝতে পারে না।
সাঃ গদ্যের যুক্তিকে আপনি কিভাবে
দেখছেন?
লেঃ আমি চাইছি গদ্যের যুক্তিকে
হেরে যেতে দেখতে। দ্যাখো, কবি চেয়েছে তার মাথাটাকে নিয়ে স্বর্গে প্রবেশ করতে। আর একজন তার্কিক
চেয়েছে, তার নিজের মাথার ভেতরে স্বর্গটাকে ঢোকাতে। অ্যান্ড
ইট ইজ হিজ হেড দ্যাট স্প্লিটস্।
সাঃ দেখুন, আমি এত কঠিন করে বললে বুঝতে
পারি না। কেঁদে ফেলি।
লেঃ আচ্ছা বেশ, বস্তুর স্বাভাবিক দুটো অবস্থা
কী? লিকুইড আর সলিড। লিকুইডের প্রতিনিধিত্ব করছে সমুদ্র।
সলিডের করছে বডি। এবারে নিশ্চই বুঝতে পারছ কেন তোমাকে আগে কলকাতায় আর তার পরে
সমুদ্রে আসতে বলেছি? এবারে দ্যাখো, এই
যে সমুদ্র আর বডি, এ দুটোর মধ্যে যোগটাকে কে সবচেয়ে বেশি
নিশ্চিত করছে? না, আলো। সে কে? সেও একটা বস্তু। কিন্তু কী অদ্ভুত, সে লিকুইডও নয়,
সলিডও নয়। কবিতায় এই মেকানিজমটা থাকে নেপথ্যে। কবির
মাথায়। কিন্তু গদ্যে এটাই সামনে চলে আসে। পাঠক চোখে দেখতে পায়। আচ্ছা, বাই দ্য ওয়ে, কিছু মনে ক’রো না, আমি কি
তোমার বুকে হাত দিতে পারি? মানে প্রেস করতে পারি?
সাঃ আপনার সাক্ষাৎকার নিতে হলে
এটা কি বাধ্যতামূলক?
লেঃ নাহ্, তা কেন হবে।
সাঃ আপনি এ কথাটা কেন বললেন
জানতে পারি?
লেঃ নিশ্চই। পুরীর মন্দিরের
দেয়ালে সন্দীপন এক নগ্নিকার ভাস্কর মূর্তি দেখেছিলেন, জানো। খুব
গরমের দিন ছিল। দুপুরবেলা। তিনি সেই পাথরের মূর্তির বাম
স্তনে হাত রেখেছিলেন। তুমি নিশ্চই বিশ্বাস করবে না, তার স্তনটা ছিল পাখির মতো নরম
আর উষ্ণ। তোমার মুখের সাথে সে মুখের কোথাও মিল আছে। খুব মিল।
সাঃ আচ্ছা? বেশ। কিন্তু সন্দীপনের সেই
ঘটনার সাথে আপনার এ-কথার কী সম্পর্ক?
লেঃ সন্দীপন একটা লেখায় এই
ঘটনাটা লিখেছিলেন। ক বছর আগে আমি এক গ্রীষ্মে পুরীতে গিয়ে একই জিনিস করি।
সাঃ এবং আপনারও একই অভিজ্ঞতা
হয়েছিল
লেঃ হ্যাঁ।
সাঃ বেশ। বিশ্বাস করছি। যে কথাটা
দিয়ে আমরা কথা শুরু করেছিলাম, একজন সাংবাদিক একগুচ্ছ সত্যি বলতে বলতে মিথ্যেতে এসে দাঁড়ান। একজন
গল্পকার একের-পর-এক মিথ্যে বলতে বলতে সত্যতে এসে উপনীত হন। কিন্তু কবির বেলায় কী হবে?
লেঃ আরে, সে তো মহা হারামি।
সত্যি-মিথ্যে দুটো নিয়েই কাজ করে, দু’জায়গাতেই
পৌঁছায়। শুধু তা-ই নয়, মাঝেমাঝেই তাকে দেখা যায় সত্যি আর
মিথ্যের চেয়ার অদল-বদল করে দিতে। এমনকী দুজনের মধ্যে অনেক শেডও সে নিয়ে আসে। সত্যি
আর মিথ্যে যে প্রকৃতই আপেক্ষিকতাবাদের ধারণাকে প্রমাণ করে তা কবিদের না দেখলে এত
ভালো করে বোঝা যেত না। এই ধরো, আমি যখন লিখেছিলাম, ‘শালবনকে লিফট্ দিলাম প্রেমিকা পর্যন্ত’। কিভাবে
একটা ডাহা মিথ্যের ভেতরে একটা সত্যি গুঁজে দেয়া হল।
সাঃ পুরো কবিতাটা বলুন না। মনে
আছে আপনার?
লেঃ বলছি। একটু ভেবে নি?
সাঃ ভাবতে হবে না। ভুলে
গেলে থেমে যাবেন। আমরা আবার কথা বলব
লেঃ কোথাকার মা কোথায় এসে পড়লো
আকাশে বর্ষা লাগলো কারো
তুঁহুবনের পথে যতো মেঘ
গাছের গলায় রুমাল বেঁধে উড়ছে
বানালাম দক্ষিণ আর হয়ে গেল ঘন্টি
ছুটি এক স্কুলপথে সারাদিন ..
বোতামি রঙের কথা ভাবো,
আমরা যারা বাইকের —
শালবনকে লিফট্ দিলাম প্রেমিকা পর্যন্ত
সাঃ এই যে বোতামি রঙের কথা, এর তলায় তলায় তো বাদামি রঙের
কথাই আছে
লেঃ দ্যাখো, আমাদের দেশের কবিতা
আলোচনাগুলোতে এগুলো বলা হয় না, কেন যে বলা হয় না আমি জানি
না। সেটা হল, একজন কবি সবসময় এগ্জিস্টিং সিস্টেমকে মক করে।
চিরদিন করেছে। যদি সে এটা না করে, আমি মনে করি তাকে সন্দেহ
করা উচিত। বাদামি রঙকে বাদামি নাম দিয়েছে আমাদের সিস্টেম। সিস্টেম
এখানে দ্য মোস্ট পাওয়ারফুল সিস্টেম অফ দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অফ কমিউনিকেশন। এই যে একটা
সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, ভাষার ওপরে চাপানো একটা যূথ-ধারণা, বুঝতে পারছ আমি
কী বলছি?
সাঃ আপনার কী মনে হয়, কবি এই কাজটা কীভাবে করেন?
লেঃ (একটু চুপ থেকে) নিমাই যখন
সন্ন্যাস নিল, তখন তাঁর মা ওঁর পায়ে ধরে মাটিতে মাথা আছড়ে
কেঁদে বলছেন, ও নিমাই, নিমাই, যাস নে বাবা।
যাস নে...। নিমাই
তখন বলছেন, নিমাই বলে
ডেকো না মা, নিমাই বলে ডেকো না। পাবে না। কৃষ্ণ বলে ডাকো।
কৃষ্ণ বলে ডাকো। বাঙলা ভাষাটা এত সুরেলা ভাষা, এর শব্দের
মধ্যেই মিউজিকের নোটেশনগুলো রয়েছে। তুমি জানো, সা থেকে নি
অবধি সব ক’টা স্বর বাঙলায় আছে?
সাঃ কীভাবে?
লেঃ দ্যাখো, ওষুধে অসুখ সারে। সা রে,
পেলে? খালি গা। মারে, ভালো
আছিস? পা ফেলে ফেলে চল। ধানি লঙ্কা একেবারে। ধাপার মাঠে গিয়ে
উঠব। কবিতা জিনিসটা তো এজন্যেই সম্ভব হয়, যেহেতু অনেক কিছু
কবিতার বাইরে অসম্ভব।
সাঃ আপনার প্রিয় কবি কারা?
লেঃ সালভাদোর দালি, আইনস্টাইন, ফ্রানৎস্ কাফকা।
সাঃ কাফকা কেন?
লেঃ এর উত্তর সন্দীপন দিয়ে
গেছিলেন। পৃথিবীর সব গদ্যকার মরেছে ব্যাখ্যা দিতে দিতে। একমাত্র কাফকা ছাড়া।
সাঃ কবিতার মূল কাজটা আসলে কী? মানে, আমি
প্রশ্নটা এজন্যে করছি যেহেতু আপনি আপনার প্রিয় যে তিনজন কবির নাম বললেন তাঁরা কেউই
কবিতা লেখেননি। এটা বুঝবার জন্য জিজ্ঞেস করছি...
লেঃ তোমার হাতে এখন যে পেনটা আছে, এটার এই মুহূর্তের অবস্থান
তুমি জানো। যদি এই পেনটা এখন তুমি ওই কুকুরটার দিকে ছুঁড়ে মারো তাহলে এই পেনটা ঠিক
কী গতিতে ছুটে যাবে সেটা কি তুমি জানো? জানো না। ওটা ছুঁড়ে
মারার পর কুকুরটা ঠিক কী প্রতিক্রিয়া দেবে সেটাও জানা নেই। যখন বস্তুর অবস্থান
জানতে পারছি তখন তার গতি জানি না। আবার যখন তার গতি জানি, তার
অবস্থান বের করতে পারছি না। এই গ্যাপটাকে কমিয়ে আনে কবিতা। এবার বুঝলে কেন এঁদের
নাম বললাম?
সাঃ এটা কোনও কবিতা দিয়ে বোঝানো
যায়?
লেঃ অবশ্যই যায়। পৃথিবীর
সমস্ত কবিতার ব্যাখ্যা হয় এবং সমস্ত ব্যাখ্যাকে কবিতা দিয়ে বোঝানো যায়। উম্ম্... ধরো, এই
কবিতাটা... পুরোটা মনে নেই, ঠিকাছে?
ঘুমের অর্ধেক জুড়ে বৃষ্টি বসে আছে
ফলে বাকি আদ্ধেকটা তো নষ্টই হলো
খেলার শব্দ না সন্ধে
কে লম্বা জানার জন্য দেওয়াল দরকার
আঁচড় কাটার পেন্সিল দরকার
খুব দূর ভাববে না বলে
মানুষ রঙ ভাবল...
আর মনে নেই। এখানে দ্যাখো, ঘুমের যে অর্ধেক জুড়ে বৃষ্টি
পড়ছে সেটা আমার পসিবল এরিনায় রয়েছে। বাকি যে আদ্ধেকটা, সেটা
আমার ইম্পসিবল জগৎ। দুটোর ফ্র্যাগমেন্টকে দুটো আলাদা উচ্চারণে ডাকাও হয়েছে এজন্য। ফার্স্ট
হাফ-পোরশনটাকে বলা হচ্ছে অর্ধেক। সেকেন্ড হাফ-পোরশনটা আদ্ধেক। নিতান্ত নিম্নমানের
বোকারা এটাকে ভাববে কবি বোধয় একই শব্দের উচ্চারণ এড়াবার জন্য এটা করেছে। ঘুমের
অর্ধেক জুড়ে বৃষ্টি বসে আছে / ফলে বাকি অর্ধেকটা তো নষ্টই হলো, এটা যদি বলা হত তাহলে দুবার ‘অর্ধেক’ কথাটা বলার জন্য কিন্তু এমন কিছু কানে লাগছে না। এটা করাই হয়েছে দুটো জগৎ,
একটা জানা একটা অজানা, এ দুটোকে আলাদা করার
জন্য। এবার এই অজানাকে জানার জন্য আমি কী করতে পারি? লজিকের
একটা জায়গায় গিয়ে যখন আমরা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ি, তখন
ল্যাঙ্গুয়েজের সাথে মেটাল্যাঙ্গুয়েজের যে পার্থক্য সেটা আমাদের দরকার হয়। তখন
বাইরে থেকে আরেকটা কিছুকে এনে তার ব্যাখ্যায় যেতে হয়। তখন আমি, ‘খেলার শব্দ না সন্ধে কে লম্বা’ এই প্রবলেমটাকে
আনলাম। দ্যাখো, সন্ধে একটা সময়। খেলা হল সেই সময়ে ঘটা একটা
ঘটনা। কে বড়, কে দীর্ঘ এদের মধ্যে? সময়?
না সেই সময়ে ঘটা কোনও ঘটনা? এই যে আমরা এই
ভোরে কথা বলছি, এই ভোরটা লম্বা নাকি আমাদের এই কথা, সাক্ষাৎ এটা লম্বা? তুমি ভাবো তো, আজ থেকে দশ বছর পরে, কোনও এক পড়ন্ত দুপুরে একা
বাড়িতে ব’সে তোমার যদি আজকের দিনটার কথা মনে পড়ে, কী মনে আসবে তোমার? এই ভোর? নাকি
কথাগুলো? নাকি পুরোটা নিয়ে যে অ্যাম্বিয়েন্স তোমার মধ্যে
একটা রেজোন্যান্স তৈরি করল, সেটা? কিন্তু
মানুষ অত দূরের কথা ভাববে না। সে এখনকার, এই মুহূর্তের হিসেব
চায়। তখন সে লিটমাস টেস্ট করল। রঙ ভাবল। কার রঙ পাল্টাচ্ছে? খেলার শব্দের রঙ নাকি সন্ধের
রঙ? উত্তর তোমার জানা। এবারে দ্যাখো, এই
যে রঙ পাল্টাচ্ছে, তার মানে রঙের একটা অভিমুখ আছে। অভিমুখ
আছে মানে তার গতি আছে। গতি আছে মানে তার চক্রবৎ পরিবর্তন্তে আছে। আমার যদ্দুর মনে
পড়ছে, এই কবিতার
শেষটায় ছিল—
ঘুমের এপাশ নষ্ট, ওপাশটায় জল
এক চিলতে চোখের ওপর
আমি এবার চাকা শিখবো
আমি কিন্তু একটা সলিউশন বের করতে পারলাম। এটাকে
সলিউশন না বলে তুমি হাইপোথিসিসও বলতে পারো। বিজ্ঞান হাইপোথিসিসকে স্বীকার করে।
ভাষা যদি একটা বিজ্ঞান হয়, সেই ভাষায় রচিত সাহিত্য ইটসেলফ একটা বিজ্ঞান। কবিতা ম্যাথামেটিক্সের মতো
একটা পিওর সায়েন্স। পৃথিবীর সেরা সেরা দার্শনিকেরা যে একইসাথে অসামান্য গণিতজ্ঞও
ছিলেন, এটা নেহাতই কাকতালীয় ঘটনা নয়। আমার আরও একটা পয়েন্ট
আছে। দ্যাখো, একটা লাইন রয়েছে এখানে, ‘মানুষ
রঙ ভাবল’। তাই তো? কেন? ভাবল কেন? রঙ ভাবার জিনিস হল কবে? আমরা মানুষেরা, এমনিতে কতগুলো রঙ দেখি? আমাদের একটা রঙীন জগৎ আছেই। এই যে আমি গেরুয়া পাঞ্জাবি পরে আছি, তুমি এটাকে গেরুয়াই ভাবছ, বেগুনী তো ভাবছো না। অনেকদিন
পরে যদি তোমার আমার মুখটা মনে পড়ে, তখন তোমার মনে আমি এই গেরুয়া পাঞ্জাবিটা
পরেই হয়ত আসব। একটা গোরুকে দ্যাখো, তার চোখে কিন্তু জগৎ
শাদাকালো। এবারে বলো, কোনটা সত্যি কোনটা মায়া? কোনটা বাস্তব আর আর কোনটা ভেবে নেয়া?
সাঃ আমরা কি এখন উঠতে পারি? একটু হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি?
গ্রামটাও হয়ত জেগে গেছে এতক্ষণে। দেখতে দেখতে যাব।
লেঃ নিশ্চয়
নৌকো থেকে ওরা দুজন নামে।
হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যায়। মেয়েটির শাড়ির পাড় কাদায় জলে মাখামাখি হয়। মেয়েটি সেদিকে
ভ্রূক্ষেপই করে না। কথা বলতে বলতে হাঁটে।
লেঃ তোমার শাড়ি তো অর্ধেক ভিজে
গেল
সাঃ আপনার প্যান্টটা দেখুন
লেঃ ওঃ, প্যান্ট নিয়ে আর ভাবছি না
নদীর ধারে এসে
মাইকি নিয়েও ভাবছি না
জীপার আমায় অনেক কিছু দিলো
অ্যাহেসান ফরাস পাতা মেঘ
জানো, মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মধ্যে নাকি এরকম একটা
হাস্যরসাত্মক কথা চালু আছে যে, এমন একটা থিওরি নাকি আছে যাতে
বলা হচ্ছে, যদি কেউ এই ইউনিভার্সের আকার বিশ্লেষণ এবং তার
কার্য-কারণ-উৎপত্তি ব্যাখ্যা করে ফ্যালে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে এই ইউনিভার্সের জায়গায়
এমন একটা কিম্ভূতকিমাকার জিনিস এসে জায়গা নেবে যেটা একেবারেই অনির্ণেয় এবং
ব্যাখাতীত একটা জিনিস। মজার কথা হল, এরকম আরেকটা থিওরিও নাকি
আছে যাতে বলা হচ্ছে এই ঘটনাটা ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে।
দুজনে হাসতে থাকে।
সাঃ (হাসির রেশ ধরেই) আপনাকে একটা
কথা বলতে চাই
লেঃ বলো (লেখকের চোখে-মুখে তখনও
হাসির শেষটুকু)
সাঃ (থমকে দাঁড়িয়ে। মুখোমুখি তাকিয়ে)
আমার বাম স্তনটা পাথরের।
।। ৫ ।।
ভোর/সকাল। সমুদ্র তট। খাট
পাতা। কালো চাদর বিছানায়। গেরুয়া পাঞ্জাবি পরে লেখক শুয়ে আছে সেখানে। খোলা আকাশের
নীচে। মৃত। বিছানায় সিগারেটের খালি প্যাকেট। তার পাশে রাংতা আর প্লাস্টিকে বানানো
পুঁটলিটা। সমুদ্রের শব্দও শোনা যাচ্ছে। চারপাশে জেলেদের ভিড়।
পর্দা কালো হয়। ভয়েস ওভারে শোনা যায় বা পর্দায়
লেখা থাকে—
একজন মানুষ যখন ঘুমের মধ্যে মারা যান, সেই অন্তিম ঘুমে তিনি যদি কোনও
স্বপ্ন দেখে থাকেন, পৃথিবীর তা চির অজানা থেকে যায়। শেষ ঘুম
যেমন ভাঙে না, শেষ স্বপ্নও ভাঙে না।
.............................................................
এই আখ্যানে ব্যবহৃত কবিতা ও কবিতাংশগুলি
ইন্দ্রনীল ঘোষের লেখা। ‘জুলাইওয়ালা’ কাব্যগ্রন্থের। —লেখক
No comments:
Post a Comment