ভূমিকম্প
এই চাকরীতে মন বসছে না বেদব্রত-র। সে
শিলিগুড়ির ছেলে। আজন্ম শান্ত বাঙালী-অবাঙালী পাঁচমেশালী পাড়ায় বড় হয়ে ওঠা। বাড়ি
মানে তার কাছে দুই কামরার ফ্ল্যাট, যাতায়াত বলতে সরু নির্বান্ধব সিঁড়ি, রিকশা বা
লক্ষ্মীর ঘটের মত পোড়ামাটির মারুতি। খেলার মাঠ, অল্প-অল্প গাছগাছালী ইত্যাদি
মিলিয়ে যে পরিবেশ সে আজন্ম পেয়েছে তা মফঃস্বল থেকে হাঁটতে হাঁটতে শহর থেকে অনেক
দূরে এসে সমাপ্ত। এহ বাহ্য, প্যাচপ্যাচে গরম বা বনসাই শীত সে কখনো চামড়ার নীচে টের
পায়নি। শিলিগুড়ি থাকতে তার দুটি ঋতু ছিল। অসহ্য বৃষ্টি আর কনকনে ঠাণ্ডা – বাকিটা
বচ্ছরভর বসন্তকাল। এখন এতদূরে এসে এই আবহাওয়া অচিরেই তার চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে।
বাতাসের গাঢ় ময়শ্চার সারাদিন যাত্রাচাপা মনটা ভারী করে রাখে। আরোও পাথর আনে
মানুষের মুখ, মুখত্যক্ত কথা। লাল পারদের মত ওঠানামা গালাগালি এখানে চায়ের দোকানে,
রাস্তাঘাটে আকছার গায়ে লেগে যায়। প্রথমে কৌতুহল, তারপর অস্বস্তি আর এখন নিদারুণ
বিরক্তি বেদব্রতকে ঘড়ি জুড়ে ঘিরে রাখে। এইখান থেকে ও ছুটি চাইছে।
অথচ শুরুটা এমন হয়নি। একটা দারুণ দিনে তার
এখানে আসা। শিলিগুড়ি হঠাৎ ভূমিকম্পে কেঁপেছে, বছরচারেক পর আবার। যে গগনচুম্বী
কনফিডেন্স নিমেষে তলানি করে পায়ের তলার থরথর ধেয়ে এসেছিল তাকে এক-দেড় দশকের মধ্যে
বড় দ্রুত গড়ে তুলেছিল এই শহররাজ্যের মানুষ। চোখের সামনে সেই অহংকারের ঝুঁটি ও
খুলিশুদ্ধ নাড়া পড়তে দেখে প্যানিক এমন ছোঁয়াচে মাত্রায় ছড়িয়ে যায় যে
প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব হারিয়ে ফ্যালে ন্যুন বাস্তববোধ। মধ্য-উচ্চবিত্ত বাসিন্দাদের
স্থাবর-অস্থাবর ছেড়ে জলের বোতল আর খাবার সঙ্গী করে রাস্তায় বসে পড়তে দেখে এসেছে
সে। এই ঘটনা যতটা তাকে টেনেছে, ততটাই বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে নিজের চারদেওয়ালের শিকড়
থেকে। আধশ্যামলা
গ্র্যাজুয়েট বেদব্রত সেন একটা ঘটমান ট্রেমর পেছনে ফেলে এসেছিল, তাই সে
বাড়তে থাকা ভয়ের আঁচ টের পায়নি। তাছাড়া প্রথম বাইরে থাকার সঙ্গে ওতপ্রোত হতে হতে
সে তার আন্দাজশক্তি খাটো করে ফেলেছিল। ওই ছোট্ট ম্যানমেড স্বর্গের বাইরের বিপুল
পৃথিবী যখন তাকে নিয়ে হালকা লোফালুফি করছে, বেদব্রত রোজ রাতে ট্রেনের দুলুনি টের
পায়। সে এখনো শিলিগুড়ি থেকে এই ছোট শহরে আসছে, অথচ এসে পৌঁছয়নি।
এখানে ভাড়াবাড়ি খুঁজে থাকার ব্যবস্থা বাবা
করে দিয়েছিল। বাবার চোখে তখন যে প্রবাসের কাজচালানো কাঙ্খিত আরাম, ইদানিং সেই
কামরাটুকুই তার চরম বিরক্তির কারণ। কখনো। কখনো অফিস থেকে ফিরে ঘন্টার পর ঘন্টা এই
অচেনা ছাতটা দেখতে দেখতে কাটিয়ে দেয়। এই ময়লা টিউবের আলো, এই ঘটাংপাখা, তার মাঠে
মাঠে মাকড়সাদের ভরভরন্ত সংসার। মাকড়সাদের, সে বহুদিন লক্ষ্য করেছে, বাড়িঘর ফাঁকা
দিয়ে তৈরী। অনেকগুলো সি-থ্রু দৃশ্য ঝুলের বর্ডার দিয়ে জুড়ে মাকড়সা বসে বসে দোল
খায়। একটাই ছাতের নানান প্রান্তে হয়তো বেশ কয়েকটা মাকড়সা। প্রকাশ্যে আলোর মধ্যে
তারা শিকার ধরতে বসে আছে। অথচ এতটুকু চক্ষুলজ্জ্বা নেই। এতগুলো চোখ যার, তার কেন
চোখ নিয়ে লজ্জ্বা থাকবে? চক্ষুলজ্জ্বা নেই এমন মাকড়সারা অফিসেও তার চারিপাশ ঘিরে
থাকে। বেদব্রত অসহায় শিকার হয়ে একটা অলৌকিক ওয়েআউট-এর অপেক্ষা করে যেটা অঙ্কের
হিসেবে প্রায় অসম্ভব, কল্পনার হিসেবে হয়তো কিছুটা কম।
আজ অফিসে যাদের দেখেছে, তাদের কেউ কেউ এখন
এখানে আসতে পারে। না-ও পারে, কিন্তু অন্ততঃ আসুক – বেদব্রত চায়। এবং একজন এল।
ভ্যাজানো দরজা সন্তর্পণে খুলে ঘরের কোণে গিয়ে দাড়াল। এই কোণে কোন চেয়ার নেই।
টিউবের আলো পড়ে কন্সট্যান্ট পাখার ধাক্কায় দপদপ করছে। লোকটার শরীর ছায়া ফেলে
রেখেছে দেয়ালে। নিবু নিবু সস্তা রঙের মরা দেয়াল। মেঝের ড্যাম্প শিকড় ছড়াতে ছড়াতে
ছাতে উঠে গিয়েছে। লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, একটু পরে বেদব্রতকে নিয়ে যাবে। এ লোক কোন
ট্রেনের লোক। বেদব্রত ভাবতে ভালোবাসে বাড়ির দিকে যাবার প্রত্যেকটা স্টেশনে তার
জন্য একজন দন্ডায়মান। তাদের মধ্যে একজন এগিয়ে এতদূর। এইখানে।
তার শরীর যে উঠেছে তা বেদব্রত প্রথমে বুঝতে
পারেনি। বিছানা থেকে মাথা ঘুরিয়ে দেখল সে লোকটার পেছন পেছন দরজা খুলে বেরিয়ে
যাচ্ছে। বাইরে শেকল নেই, ছিটকিনি নেই, নতুন হ্যাচ আছে কিন্তু তালাটা পুরনো, ধারে
ধারে জংধরা। বেরোবার আগে তালাটাও সে ভালোভাবে লক্ষ্য করে। কুকুর হিসু দিয়ে পথে চিহ্ন রেখে যায়। বেদব্রত
একটা নীচু দৃষ্টি রেখে গেল, ফিরে এলে চেনা লাগবে।
এরপর আর কিছু নেই, লাল ইঁট পাতা আর শেষে
লোহার গেট। গেট খুললে গলি, কাদা গর্ত গড়াতে গড়াতে পাড়ার মধ্যবিত্ত স্ট্যাটাসের
হাইরোড। অজস্র পান-বিড়ি-চিপসে দু-কাঁধ সাজিয়ে পা চালাচ্ছে। এইখানে আসা মানে
বেদব্রত-র মন থেকে সবচেয়ে বেশি দুরত্ব। এটা তার বাড়ির লক্ষ্মণরেখা। এর বাইরে পা
দিলে বাঁদিকে মালদা ডানদিকে দিনাজপুর। মাঝখান ফূঁড়ে আলোর একটা রেখা সোজা স্টেশনে
গিয়ে মিশেছে। ভাইপো-ভাইঝি মাকড়সাগুলিকে সঙ্গে নিয়ে বেদব্রত স্টেশন খুঁজতে থাকে।
একটু খুঁজে ফিরে আসে, তার হয়তো খাবার এসে পড়েছে। রাতের টিফিনকারিতে ঠোকা বারোয়ারি
ভাতপ্রসাদ। ভাত নেবে না ঠিক ক’রে বেদব্রত আবার ওইদিকে চলে যায়।
স্টেশনের বাইরে পাঁজা পাঁজা ইঁট কে যেন
সাজিয়েছিল কোনোদিন, বাড়ি করবে বলে। আজ সেই লোকটা নামহীন। তার কেনা ইঁটগুলো হাভেলি
হয়ে গিয়েছে। অন্ধকার গরম জঙ্গল গুছিয়ে বীর্য্য আসার পথ মসৃন করে রেখেছে। এইখানে
একটা একটা পা একে অপরকে চিনতে পারেনা। ওঠার সময়-ও না, নামার সময়-ও। অন্ধকার হলে
মনে হয় সবাই দেখতে পাচ্ছে, এই চোখদুটোই শুধু জিরো। হাত পা এত লজ্জ্বিত থাকে যে
নড়নচড়নগুলি রসে জবজবে পৃথুল, স্লথ। স্টেশন পর্যন্ত এসেও বিশ্বাস হয়না গত অন্ধকারটি
তরল না শুন্য ছিল।
স্টেশনের ছবি সব স্টেশনে এক। ভিখারীগুলি
চেনা, পানের পিক বোঁটকা গন্ধ সবকিছুতে ভারতীয় রেলের লোগো এমবস্ড। এতক্ষণে বেদের
দল বিরাট। সে বিস্তৃত কালো চাদর উড়িয়ে একটা বেঞ্চিতে চুপচাপ গিয়ে বসে। এতক্ষণ এত
কথা বলেছে সে ছাড়া কেউ বিশ্বাস করবে না। শুধু গলা শুকিয়ে গেছে, লালা নেই। বুক
ধপধপ। বেঞ্চির এই হাতলটা ধরে একবার, স্লাইড করে গইয়ে আবার ওই হাতলটা ধরে। এই
হাতলটা, ওই হাতলটা। এটা, ওটা।
This comment has been removed by the author.
ReplyDeleteউপমাময় বর্ণনা, দৃশ্যের ভেতর অসংখ্য ক্ষুদ্র দৃশ্যকে আলোকিত করা আর ঝরঝরে গদ্যের সাবলীলতা, সবমিলিয়ে দারুণ। আশা করি গল্পকারের আরো অনেক গল্প পড়তে পারবো। শুভকামনা।
ReplyDelete